আমার ধর্মপিতা যেমন
অরুণ জ্যোতি ভিক্ষু, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
দেড়
যুগেরও আগে এক কিরনোজ্বল প্রভাতে
বুদ্ধির সংক্ষিপ্ত বিকাশের মাঝে একটি দেবতা আমাকে ভর করেছিল। সেই
দেবতা আকাশ মার্গের কেউ নন আমার কর্মদাতা
পিতা আজকের মহাস্থবির বরণ নায়ক। একদিকে তিনি ভীষন রাগী, জেদী ও কঠোর শাসক
অন্যদিকে দয়া, ভালোবাসা ও কর্মগুনে আজ
কর্মবীর উপাধিতে ভূষিত। পিতা পুত্রের সম্পর্কের এই গৌরচন্দ্রিকায় আমার
দেখা গুরুদেবকে পাঠকদের সামনে প্রকাশ করবো।
বৌদ্ধ
প্রধান দেশ গুলোর ন্যায় কুড়িবছর আগে আমাদের গহিরা অংকুর ঘোনায় (ভান্তের পূর্ববিহার) প্রভাতি শিক্ষা নিকেতন চালু ছিল। সকালে এক হাতে স্লেট
বই অন্যহাতে ছেড়া পেন্টটা ধরে শীতের সর্দিতে অনেক কষ্টে নাক মুচতে মুচতে ক্যায়াং এ পড়তে যাওয়ার
মাঝে এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাতৃজননীর হাতধরে উপাসনায় যাওয়ার মাঝে পেয়েছিলাম ভান্তেকে। আমার বয়স সাত, পড়ছি ক্লাস টুতে একদিন অনেক আগ্রহ নিয়ে উপোসথ দিনে আমি অষ্টশীল গ্রহণ করলাম মাকে অনেক ভাবে রাজি করিয়ে। শীলগ্রহন ও বুদ্ধপূজা শেষে
দুপুরে ভাত খেতে যখন বাড়ি ফিরছিলাম পেছন থেকে আমার নাম ধরে একটি ডাক আসল। সত্যি বলতে কি এই ডাক
আমার জীবনের মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিল। ডাকটি ছিল সেই সময়ের ভান্তের দিৰ্দ্দেশে সেবক আনন্দের, আমার মনে হয় যেন বুদ্ধের
নিদ্দেশে থের আনন্দ কোন ব্রাহ্মন সন্তানকে ধর্মে দীক্ষিত করলেন। ভান্তে কোমল মধুর কন্ঠে বললেন" অনে অষ্টশীল লইঅন না?" উত্তরে বললাম 'লই ভান্তে। ভান্তে
উপসিকাদের বললেন একে আমার পাশে বসিয়ে ভাত দিন। খাওয়ার মাঝে ভান্তে তাঁর পাত্র থেকে একটা তরকারী আমার থালায় দিলেন। এই তরকারীর মাঝেই
ছিল কবচ বলুন, মোহিনী শক্তি বলুন, ধর্মের আকর্ষন বলুন বা অতীত জন্মের
পূণ্যফল সবকিছুই নিহিত ছিল। জন্ম বৎসর থেকে পিতৃস্নেহ বঞ্চিত এই অভাগার কচি
মন যেন সেদিনই খুজে পেয়েছিল হিমালয়ের মত এক শক্ত
ভিত যার সিড়ি বেয়ে কখনও হোচট খেয়ে আবার কখনও বৈদ্যুতিক লিফট বেয়ে আজ আমি কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ঢোকার প্রবেশ পত্র পেয়েছি। সেই মাসেই সাত বছরের এই শিশু ভান্তের
চরণে সেবকের নাম লিখিয়েছিলাম। বলে রাখি, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ে ১২ বৎসর বয়সে
শ্রামন্যধর্মে দীক্ষিত হই। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৯৫ সালের
২৬শে মার্চ ভিক্ষুধর্ম লাভ করি। আজ তার সাতাইশ
বছর। এই অবিশ্রান্ত পথে
আমিই পরবর্তীতে সেই আনন্দের দায়িত্বে এসেছি। আর প্রতি মূহুর্তে
গুরদেবকে যেমন দেখেছি তার কিছুটা আলোকপাত করবো
কঠোর নিয়মের মানুষ আমার গুরুদেব। আইনের যুক্তিতর্কে আইনজীবির চেয়ে কম নয়। এমন কঠোর মানুষ ক্ষমাগুনে এত মহৎ কল্পনাতীত। কাজ আর কাজ এই তাঁর ব্রত। শীল মাধুর্য্যে তাঁর মুখশ্রী এত সুন্দর যা ধ্যানের সিড়ি বেয়ে গহিরা আন্তজার্তিক মহাশ্মশান ভাবনা কেন্দ্র হয়ে অনেক মানুষ ধ্যানের গভীরে যাওয়ার সুযোগ লাভকরেছে। দোষে গুনেই মানুষ, যারা মার্গলাভী নয় তাদের মধ্যে কোন ভিক্ষু বা গৃহী যদি বলে চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই তবে জানতে হবে তার মত মিথ্যাবাদী কমই আছে। গুরুদেবকে আমি যেভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি আমার সতীর্থ প্রায় ৩০/৩৫ জনের মধ্যে কেউ পায়নি (অনেকে এখন নেই)। প্রচন্ড রাগী আমার গুরুভান্তে, এত রাগী মানুষ ভালোবাসার গুনে আবার বিপরীত মেরুর। তাঁর ভালোবাসা শিষ্য ও গ্রাম বাসীদের নিয়ে। সেই ভালোবাসার সাগরে তিনি আমাকে রেখেছেন। আমি সেই সাগরে ১৬বছর ধরে সাতাঁর কেটেছি, কিন্তু মনি মুক্তো ছাড়া কিছুই পাইনি। দুর্জনেরা অনেকভাবে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করেছে। আমি ভাবি সেটা তথাগতের বিরুদ্ধে চিঞ্চার অপচেষ্টার মত। কারন গুরুদেবকে আমি কখনও শীলচ্যুত হতে দেখিনি। গহিরা থাকাকালে একবার ভান্তে রোগে মৃতুশয্যা প্রায় আমরা অনেকে কাদছিলাম। সেই সময়ও রাত্রে সাগু খাওয়াতে পারিনি। সেদিনের এক ঘটনা বলি, ২০০০ সালে ভান্তে তীর্থভ্রমনে যখন কলিকাতা পৌঁছলেন (আমি সেই সময় কলিকাতা বিদ্যালয় হতে বি.এ. অনার্সে ফাষ্ট ক্লাস হয়ে এম.এ. ভর্তি অপেক্ষায় ছিলাম)। তিনি দুপুরে খেতে পারেননি জেনে, আমি হরলিক্স কর্ণফ্লাক্স (Corn Flaks) মিশ্রিত করে ভান্তেকে দিতে ভান্তে বললেন ও গুলো কি, উত্তরে বললাম Corn Flaks বানিয়েছি, খেয়ে নিন। তিনি রেগে বললেন "এক থাপ্পর দিয়ে দাঁত ফেলে দেব"। আমি আশ্চর্য হলাম, আমার গুরুভান্তে এতদিনে একটুও বদলাননি? আপনি কি ভাববেন? বলুন, এ মানুষটি কি বিনয় লঙ্ঘন করতে পারেন? বর্তমান সমাজকে প্রয়োজনে ভিক্ষুরা বিকালে এই রূপ সামন্য আহার গ্রহন কতটুকুই বা দোষের? কিন্তু সেদিন আমি আমার গুরদেবকে তা গ্রহণ করাতে পারিনি।
কাজই
যার ধ্যান জ্ঞান তিনিই আমার ধর্মপিতা। কাজে ডুবে থাকাই তাঁর আনন্দ। আমি দেখেছি তাঁকে যখন গঠনমূলক কাজ নেই তখন তিনি ছটফট করতেন। ভিক্ষু হয়েই তিনি গহিরা অংকুর ঘোনা এসে বিহার সংস্কার করেন। অতঃপর ২ বৎসর বনভান্তের
সান্নিধ্যে রাঙ্গামাটিতে ধ্যানে চলে যান। আবার গহিরা বাসীদের অনুরোধে গহিরা এসে গহিরা মহাশ্মশানকে আন্তজার্তিক ধ্যান কেন্দ্র রূপে গড়ে তোলেন। গহিরায় গচ্ছিত অর্থ যখন শেষ তিনি পাড়ি দিলেন আবদুল্লাপুর ১৯৮৮ সালে। আবদুল্লাপুর দোতলা বিল্ডিংয়ের কাজ শেষে তিনি চন্দ্রঘোনা লালন্দা বিহারের সংস্কারে যোগ দেন, কিছুদিন পর তিনি হলদিয়া
ফিরে আসেন। বিহার সংস্কারের ফাঁকে তিনি সেখানে এক মনোরম বৃক্ষবাগান
গড়ে তোলেন। যা ভবিষ্যতে সোনা
ফলাবে হলদিয়ার বুকে (যদি ঠিকমত রক্ষিত হয়।) অতঃপর তিনি তাঁর উপসম্পদা স্থান ধর্মপুর বিহার পুণঃ নির্মানে সহায়তা করেন। অতঃপর আবার আবদুল্লাপুর শাক্যমুনি চৈত্য আধুনিক রূপে প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত আছেন যেখানে কাজ সেখানে ভান্তে। ভান্তে বলতেন, ধ্যান করার সুযোগ আমি পাচ্ছিনা, লেখার অভ্যাস ও করিনি। যদি
কাজ ও না করি
তাহলে সময় কাটাব কি করে। আজ
সেই কাজের মানুষকে যোগ্য সম্মান কর্মবীর উপাধিতে ভূষিত করছে আবদুল্লাপুর বাসী।
তিনি
প্রচন্ড রাগী মানুষ যা দূর থেকে
বোঝা মুস্কিল। তিনি আমাদের কঠোর নিয়মে রাখতেন। তার বিছানার নীচে তিনটি বেত তেল মালিশ করে রাখা থাকত। এই বেতের মধ্যে
ছিল মানুষ করার মন্ত্র। হাতের আঙ্গুল থেকে কনুই পর্যন্ত সামান্য দোষে প্রায়ই লাল হতো। আবার চরম দোষেও সর্তক করে ছেড়ে দিতেন। আমার এক সতীর্থ মিথ্যা
বলাতে ভান্তে তাকে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে তিনটি বেত একসাথে তার পিঠে চালিয়েছেন দীর্ঘ বিশ মিনিট। অতঃপর তাকে তৈল মালিশ করে আবার ঔষধ ও দিয়েছিলেন। তাই
আমরা বলতে বাধ্য হই শাসন করা
তাকে সাজে সোহাগ করে যে। ভান্তের কাছে দোষ করলে তা স্বীকার করে
নিতে হয়, মিথ্যাকথা ও চুরি এই
দুটোতে ভান্তে চরম শাস্তি দিতেন। আমি দেখেছি কেহ যদি ভান্তের সাথে উল্টো কথা বলে ভান্তে এমনডাক দিতেন হাত থেকে অনেকের কাপ গ্লাস পড়ে যেত। অপরদিকে দেখেছি গহিরায় এক বড়ুয়া রাজমিস্ত্রী
টাকার গোলমালের জন্য ভান্তেকে বড় শব্দে কথা
বলায় গ্রাম্য ছেলেরা তাকে মারতে উদ্ধত ভান্তে সেদিন তাকে বাঁধিয়েছিল। যাকে তিনি শাসন করেছেন তাকে পরে স্নেহাদরে ডুবিয়ে রাখতেন।
ভান্তের বর্তমান ১৫জন শিষ্যের মাঝ আমাকে গড়ে তোলেছেন একেবারে ছোট কাল থেকে। তিনি শিশু বাচ্চাদের খুব স্নেহ করতেন। আমার লেখাপড়ার জন্য তিনি সবসময় উদার ছিলেন। এখন ও তাই তার স্বপ্ন আমাকে যোগ্য মানুষ করার। আমি যখন প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করলাম তিনি বললেন," তুমি যত খাবে আমি তত খাওয়াব।" আমি যখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. অনার্সে রেকর্ড মার্ক নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ভারত সরকারের স্কলার শিপ পেলাম গুরুদেব আমাকে লিখলেন, "এতদিন তোমার কিছুই চাইনি আজ একটি জিনিষ চাইব সেটা হচ্ছে তোমার পি.এইচ.ডি. সার্টিফিকেট। যে দিন তুমি আমাকে সেটি দিতে পারবে সেদিন আমি প্রকৃত আনন্দ পাবো।" আমি এখনও সেই গুরুপুজো থেকে অনেক দূরে আপনাদের প্রত্যেকের শুভ কামনায় চেষ্টা করবো ডক্টরেট সনদ দিয়ে গুরুপূজো করার। ভান্তে ব্যক্তিগত ভাবে কোন ব্যাংক একাউন্ট করেননি। যার কারনে আমাদের অনেক সময় অর্থকষ্টে ভোগতে হয়। আমার মত আরও ৬/৭ জন ছাত্রশিষ্য ভান্তের। ভান্তে যা দান
দক্ষিনা
পান তা আমাদের খরচে
চলে যায় বাকিটা বিহার ফান্ডে। ভান্তের কাছে একসাথে ৫/৬জন সেবক
শ্রমন থাকে। গ্রামবাসীরা আপত্তি করলে পালার ছৌয়াইং বন্ধ করে আমাদের নিয়ে ভিক্ষা করে খেতেন। ছোটকালে আমি যেমন ভালো ছিলাম তেমনি ভোলা মনের। ভান্তের অর্থ থাকত আমার হাতে। আমি ভূলে অনেক টাকা হারিয়েছি, নষ্ঠ করেছি। তার জন্য উপদেশই হতো আমার সম্বল। ভান্তের কাছে হিসাব দিতে হতো ২৫ পয়সারও, যতক্ষন
হিসাব মিলবেনা ততক্ষণ উঠতে পারতাম না। ভান্তে জানতেন আমি সৎ। সেজন্য বলতেন হিসাব মিলবেই। শেষে সত্যিই মিলে যেত।
একদিন
গহিরা দানবাক্সের টাকা চুরি হয়েছিল তালা ভেঙ্গে। তখন আমরা ৪জন শ্রমন ছিলাম। আমি সবার বড় বাকিরা একেবারে
ছোট। ভান্তের সন্দেহ কেন জানিনা আমার উপরে পড়লো। ভান্তে প্রকাশ্যে কিছু বললেন না সবাইকে একটু
জেরা করে ছেড়ে দিলেন। সবাই ছোট শ্রমন তাদের দেখলে আদর আসে জেরা নয়, আমি পড়লাম মুস্কিলে, বড় হিসাবে কাঠগড়ায়।
ভান্তেকে শুধু বললাম আমাকে প্রয়োজনে ছোট শ্রমনদের মারতে অনুমতি দিন। ভান্তে নীরব সম্মতি দিয়ে আবদুল্লাপুর গেলেন। আমি চারটা বেত নিয়ে ভান্তের পদ্ধতিতে জেরা করে স্বীকার করলাম কারা দান বাক্স ভেঙ্গেছে। যারা একেবারে ছোট সে দুজন মিলে
করেছিল। ভান্তে পরদিন ফিরলে ভান্তেকে বললাম ঘটনাটি। ভান্তে বিশ্বাস করলেন না। শেষে তাদের স্বীকারোক্তিতে পথ ধরতে হলো
বাড়ির উদ্দেশ্যে তাদের মা-প্রাবার হাত
ধরে। ভান্তে এক দায়ককে বললেন
অরুণজ্যোতিকে আইন পড়ালে ভালো হয়। এভাবে আমার প্রতি ভান্তের বিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। আমার মার দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও গুরু ভান্তের
উদারতা ও পরামর্শ আমার
এই জীবন পঠনে একমাত্র সহায়। সাথে যুক্ত করতে হয় শ্রদ্ধেয় ডঃ
জিনবোধি ভান্তের অনুপম সহযোগীতা। যা ব্যতিত হয়তঃ
আমার কলকাতা আসাই হতনা।
প্রদ্ধেয়
গুরুভান্তের মহাস্থবির বরন অনুষ্ঠান আর ৪/৫
বছর আগে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা অনেকে প্রবাস জীবনে। ব্যক্তিগত ভাবে ভান্তেও শ্রদ্ধেয় জ্ঞানশ্রী ভান্তের মত। তিনি বলেন অনুষ্ঠানের পয়সা আমাকে দাও আমি ভাজ করি। মহাস্থবির বরণ দিয়ে কি হবে। "পূজা
চ পূজনীয়াং এতং মঙ্গলং মুত্তমং।"" যে দেশে গুনীর
সমাদর নই সে দেশে
গুনী জন্মায় না"। বিশ্ব মানব
বুদ্ধ এবং যুগ লেখকের এই সমার্থক উপদেশে
অষ্টগ্রাম বাসী হলদিয়া, ধর্মপুর, লাঠিছড়ি, আবদুল্লাপুর, ফতেপুর, কোঠের পাড়, নানুপুর ও ফতেনগর) কতৃর্ক
যে আমাদের বায়িত্ব তারা সম্পাদন করছে তার জন্য অসংখ্য শুভাশীষ জানাচ্ছি প্রবাস জীবন থেকে।

No comments