কর্মযোগী শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি মহাথেরো ও বর্তমান সমাজের প্রেক্ষিত: একটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা
অর্থদশী বড়ুয়া
অধ্যাপক, চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ।
মহাকাল সবকিছুই হরণ করে, কালের ধারায় পৃথিবীর পার্থিব অপার্থিব সব সৌন্দর্যই বিলীন হয়ে যায়। তাই বুদ্ধের উচ্চারণ 'কালো ঘসতি ভুতানি' কাল সবকিছুই হরণ করে। তথাপি মানুষ চিরন্তন অবিনাশী ও অমরত্ব লাভে সতত প্রয়াসী। সেই জন্যই বার বার মানুষ তাঁর জীবনকাল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত জেনেও অনন্তকাল স্মৃতির জগতে স্মরণীয় হয়ে দীপ্তিমান থাকার জন্য প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যায়। কিন্তু সবার পক্ষে সেই সুদুর্লভ জীবন লাভ করা সম্ভব নয়। সকলের মাঝে থেকেও যিনি জীবন সাধনায় কর্ম চেতনায়, আপন ভুবনকে মহিমান্বিত করতে সক্ষম তিনিই কালের ধারায় অনন্ত কাল না হলেও শত সহস্রাব্দি কাল স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন।
বাঙ্গালি বৌদ্ধ সমাজে শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি মহাস্থবির সমকালীন সময়ে একটি গৌরবদীপ্ত নাম। জীবন সাধনা ও আপন কর্মনিষ্ঠায় ইতিমধ্যে তিনি আপন ভুবন সৃষ্ঠিতে যে অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন তা আমাদের সকলের কাছে এক অনুকরণীয় ও অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখযোগ্য। শীল সাধনায় নিরত ও সম্যক কর্মে আত্মোস্বর্গকারী ও ধীমান ভিক্ষু আমাদের সবার জন্য এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ শাসন সদ্ধর্মের কল্যাণ ধারায় নিয়োজিত থেকে গৌরবদীপ্ত ভূমিকা রেখে চলেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
১৯৪৬ সালে ৭ই জুলাই এক সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম নেন, নিরোধ বরণ মুৎসুদ্দি। পিতা রোহিনী রঞ্জন মুৎসুদ্দি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সদস্য। মাতা কুসুম বালা মুৎসুদ্দী বিখ্যাত দার্শনিক আচার্য বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর গৃহী জীবনের একমাত্র কন্যা। এ নিরোধ বরণ মুৎসুদ্দী আমাদের প্রিয়ভাজন শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি মহাস্থবির। নিরোধ শব্দটি বৌদ্ধ দর্শনের একক পরম সত্যকে নির্দেশ করে যার অপর নাম নির্বাণ। সকল দুঃখের নিরোধ বা উপশমই নির্বাণ। সমগ্র ত্রিপিটকের মূল সুর নিরোধ বা নির্বাণে প্রবিষ্ট হয়েছে তাই নিরোধকে যিনি বরন করেন তিনি প্রকৃতভাবে নির্বানকে বরণ করেন। শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি ভন্তের গৃহী নামটিতে ও তার অনাগত জীবনের এক উজ্জ্বল দুরদর্শী ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়। নাম আর কর্মের মধ্যে পৃথিবীতে খুব কম মানুষের মধ্যে মিল পাওয়া যায়। প্রায়শ: অন্ধ ছেলের নাম পদ্মলোচনের মত। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে তা অভাবনীয় মিল লক্ষ করা যায় এযেন সোনার হাতে সোনার কাঁকন।
শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি ভন্তের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৪ সাল হতে। গহিরা জেতবন বিহারে অবস্থাকালীন আমি ঐ বিহারে বেশ কয়েক বার তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ লাভ করি। বিশেষত গহিরা বোধি বিহারে তখন অবস্থান করতেন ভিক্ষু জ্ঞানজ্যোতি মহোদয়। তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিঢ়। তাঁরই মাধ্যমে মূলতঃ শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষুর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ও পরিচয় ঘটে। সেই থেকে প্রায় বার বছর আমার গৌরবদৃপ্ত সাংঘিক জীবনে কতবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। যতবার দেখা হয়েছে ভন্তেকে দেখেছি হাসিমাখা মুখ এবং অত্যন্ত সযত্নে কোমল আহ্বান 'জ্ঞানপ্রিয় তুমি কেমন আছ' সেই স্মৃতি এখনও আমাকে বার বার দোলা দেয় এবং সেই গৌরবনীয় অতীত আমাকে স্মৃতির বীণায় বারংবার হাতছানি দিয়ে বিভোর করে রাখে। যেন কবি গুরুর সেই বিখ্যাত গানের পংক্তিগুলো মানসপটে জেগে উঠে।
পুরনো
সেই দিনের কথা
শুনবে
যদি হায় ওযে
প্রাণের কথা সে কি ভুলা যায়
একজন
আদর্শ ভিক্ষ হিসাবে শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি মহাথেরোর মধ্যে সকল গুণের সমন্বয় ঘটেছে। করণীয় মৈত্রীসূত্রে ভগবান উল্লেখ করেছেন-
"সন্তস্সকো চ সুভরো চ অল্পকিচ্চো চ সল্লহুক বৃত্তি সন্তিন্দ্রিযো চ নিপকো চ অল্পগম্ভো কুলেসু অননুগিদ্ধো।"
"অর্থাৎ ভিক্ষু তিনি যথালাভে সন্তুষ্টচিত্ত, মিতাহারী অল্পকৃত্য (বিবিধ কাজে অলিপ্ত) অল্পে তুষ্ট, শান্ত-ইন্দ্রিয়, প্রজ্ঞাবান, চঞ্চলতাহীন এবং গৃহস্থ বা গহীস্থলের প্রতি অনাসক্ত হবেন। এই সমস্ত গুণরাজি তাঁর মধ্যে বিদ্যমান থাকা সমকালীন আমাদের ভিক্ষু সংঘের মাঝে যে কয়েকজন আদর্শ ভিক্ষু সমাসীন তাঁর মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি যোগ্য গুরুর যোগ্যতম শিষ্য। তাঁর গুরুদেব ভিক্ষুকূল গৌরব শাসনশোভন শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি মহাস্থবির। ধ্যান সাধনায়, কর্তব্য নিষ্ঠায়, বিনয়ানুকুল জীবন গঠনে তিনি সদা তৎপর। পবিত্র ভিক্ষু জীবনের আদর্শে পরিচালিত তার পুত-পবিত্র জীবন সমকালীন বৌদ্ধ সমাজের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।
আজ সমাজের সর্বক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও নৈতিকতার যে ধ্বস নেমেছে তা রীতিমত আশঙ্কাজনক। সর্বক্ষেত্রে শুধু নীতিবোধ, শৃংখলাবোধ ও বিনয় সম্মত জীবন আচরণ ক্রমশ শূণ্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। ফলে সমগ্র সমাজ সদ্ধর্মে সর্বত্র অস্তিরতা বিরাজমান, লক্ষ্য ভ্রষ্ঠ হয়ে সকলের জীবন গতিহীন ও নির্বিকার হয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র যথার্থ অনুশীলন কারী, সদ্ধর্মরক্ষাকারী, সদ্ধর্মভাষক, সুসংগঠকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সকল ক্ষেত্রে অনৈতিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে। নেতৃত্ব আর কর্তৃত্ব লাভের জন্য অনেকে নীতিভ্রষ্ট হচ্ছে। মিথ্যা সম্মাননা লাভের আশায় গুণী সেজে গুণীসংবর্ধনা সভায় আসন গ্রহণ করে। নিজকে গুণী হিসাবে সমাজে জাহির করতে তৎপর হয়ে চলেছে। মানুষকে আকর্ষন করার জন্য নামের সাথে বড় বড় ডিগ্রী ও বিশেষণ যোগ করে দিচ্ছে। ভিক্ষু দায়ক সকলের একই হাল হকিকত। কিন্তু পূর্ণজ্যোতি ভন্তে তাঁর মধ্যে নেই। তিনি নিরব সাধক, আত্ম প্রচারে বিমুখ এবং সর্বদা কর্মতৎপর। তাই তার কর্মপ্রচেষ্ঠা ও নির্দেশনায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বিহারের উন্নয়ন ও সাধনা কেন্দ্র। নাম যশের প্রত্যাশী তিনি নন। সাধনা আর কর্মনিষ্ঠায় তিনি আজীবন ব্যাপৃত। তাই তিনি সকলের বন্দনীয় ও নন্দনীয়। তাঁর ন্যায় পরায়ণতা, আদর্শবোধ পবিত্র ভিক্ষুব্রতের প্রতি অপরিসীম গারবতা বোধ আমাদের সকলের জীবনের জন্য একটি মাইল ফলক হিসাবে গ্রহণ করা যায়। সমাজের সকল হীনতা, দীনতা, সংকীর্ণতা কুপমুন্ডকতার মাঝে ও তিনি সমুদয় হীনমন্যতা পরিহার করে দল, কুল, ইত্যাদির গন্ডীতে আবদ্ধ না থেকে নিজকে একজন জীবন সাধক ও নিষ্ঠবান কর্মযোগী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এ যেন আমাদের জন্য আরেকটি শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত। ভগবান ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে বলেছেন "অপ্পলাভো পি চে ভিষ্ণু সলাভং নাতি মঞ্চঞএত
তং
বে, দেবা পসংসন্তি সুদ্ধাজীবি অতন্দিতং,
লাভ স্বল্পহলেও যদি কোন ভিক্ষু স্বীয় লাভকে অবহেলা করেন না সেই শুদ্ধজীবি। অতন্দ্র ভিক্ষুই দেবতাদের প্রশংসা ভাজন হন। মন তখনই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে যখন ক্ষুদ্র এ সমাজের মধ্যে দল কুল নিয়ে ভাগাভাগি হয়। ইহাই স্বাভাবিক। কারণ মহান বুদ্ধ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে- নানা কুলা পব্বজিতা
অথ্যাৎ নানা কুল থেকে এসে প্রব্রজিত হয় ভিক্ষু আপন স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে আমার সংঘ সদস্য হিসাবে নিজকে প্রতিষ্ঠা করবেন একে অপরের প্রতি আপনত্ব মনোভাব পোষণ করবেন ইহাইতো বুদ্ধ শাসনের আদর্শ। কিন্তু তা আমরা ক্রমশঃ ভুলতে বসেছি এ যেন আমাদের জন্য অশনি সংকেত, ভবিষ্যৎ অত্যন্ত বিপদশংকুল। এ অবস্থা হতে পরিত্রাণ পাবার জন্য আমাদের সবাইকে বুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। বুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে শ্রদ্ধেয় পূর্ণজ্যোতি ভন্তের মত জীবন গঠন করতে হবে তাতেই আমরা সুখী হব সমৃদ্ধ হব এবং জাতি সমাজ ও সদ্ধর্মের কল্যাণ সাধন করতে সক্ষম হব।
সমাজে আজ আরেকটি ভয়াবহ পরিস্থিতি অনেকদিন থেকে শুরু হয়েছে যা সমাজ, সম্প্রদায়, ধর্ম, কৃষ্টি কোন ক্ষেত্রে মঙ্গল বয়ে আনছেনা তা হলো ভিক্ষুসংঘের উপর গৃহীর কর্তৃত্ব। এ যেন আধুনিক যুগে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত ছাত্র সংগঠনগুলোর মত। ছাত্র সংগঠনসমূহ রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুরবৃত্তি করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের শিক্ষাগুরু শিক্ষক শিক্ষিকাদের পরিচালিত করার প্রয়াসী হন। যদি কোন শিক্ষক তাঁদের এই অন্যায় আবদার গ্রহণ করতে অপারগ হন, নৈতিকতা বিসর্জন দিতে পারেনা, তাদের অবৈধ ও অনৈতিক কাজে সহায়তা দিতে অস্বীকার করেন তখন সেই শিক্ষক, শিক্ষিকাবৃন্দ লাঞ্চিত, অপমানিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। অনুরূপভাবে আমাদের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থায় তা অত্যন্ত প্রকটভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোন ভিক্ষু শ্রামন যদি নেতৃত্বদানকারী সংগঠনের সভ্যবৃন্দ ও সমাজ নেতাদের কথামত ইচ্ছেমত চলতে অক্ষমতা প্রকাশ করে অল্পদিনে সেই ভিক্ষু নীতিবান বিনয়ী হলেও তাঁকে ঐ সংগঠন ও সমাজ নেতাদের নিকট অশ্রদ্ধা ও ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। রচিত হয় তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কুৎসা ও নানা অভিযোগ নতুবা তাকে বিহার থেকে বহিস্কারের জন্য শুরু হয় নানা পাঁয়তাড়া। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে কোন কোন ক্ষেত্রে তখন আবার সেই নেতাদের সহৃদয়তা দান করে সংঘ সদস্য কতিপয় স্থবির মহাস্থবির ভিক্ষুগণ। ফলশ্রুতিতে আজ সংঘের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে আশংকিতভাবে জীবন অতিবাহিত করছেন কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছেনা। যা সামগ্রিক ধর্ম ও সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আরো সজাগ এবং পূর্ণজ্যোতি ভন্তের শত আদর্শ ভিক্ষু সৃষ্টিতে সহায়তা দান করতে হবে নতুবা এ সমাজ অচিরে কালের গতিতে বিলীন হয়ে যাবে। আদর্শ ব্যতিত কোন জাতি সম্প্রদায় ধর্ম সমাজ টিকে থাকতে পারেনা। তাই আদর্শ বিহীন জীবনের কোন মূল্য আছে বলে বিজ্ঞগন মনে করেন না। আজ আমাদের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন ভিক্ষু যিনি তিনি যথার্থ ভিক্ষু হবেন, দায়ক যিনি তিনি যোগ্য দায়ক হবেন। তবে শাসন- সমাজের প্রভুত মঙ্গল হবে কেহ কার উপর কর্তৃত্ব করার মানসিকতা পরিহার করে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে জাতি ও সমাজের মঙ্গল কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আর যদি ছাত্র/ছাত্রীরা তাঁদের গুরু শিক্ষক শিক্ষিকা পরিচালনা করতে প্রয়াসী হন তবে সেই শিক্ষার্থীগণ অবশ্যই যথার্থ জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হবে এবং নানা অকল্যাণের জন্ম দেবে যা কারও কাম্য নয়।

No comments