প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা বিদুর পণ্ডিতের জাতক অবলম্বনে বোধিসত্ত্বের পাণ্ডিত্যের স্বরূপ
বৌদ্ধ সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন হলো ‘জাতক’। এটি কেবল বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনী নয়, বরং নীতিবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব এবং প্রজ্ঞার এক অনন্ত উৎস। গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রজ্ঞার আলোকচ্ছটায় অতীত জীবনের যে ৫৪৭টি কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে ‘বিদুর পণ্ডিত জাতক’ (৫৪৫ নং) অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুদীর্ঘ। এই জাতকের মূল উপজীব্য হলো বোধিসত্ত্ব বিদুর পণ্ডিতের অটল পাণ্ডিত্য, সত্যবাদিতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা। ইন্দ্রপ্রস্থের কৌরব রাজা ধনঞ্জয়ের অমাত্য হিসেবে তিনি যেভাবে প্রজ্ঞা ও ধর্মের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়।
বিদুর পণ্ডিতের পরিচয় ও প্রাথমিক পাণ্ডিত্য:
প্রাচীনকালে কুরুরাজ্যের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থে রাজা ধনঞ্জয় রাজত্ব করতেন। সেই সময় বোধিসত্ত্ব এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম রাখা হয় ‘বিদুর’। তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল জগৎবিখ্যাত। তিনি কেবল পার্থিব রাজনীতির উপদেষ্টা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ‘অর্থধর্মানুশাসক’। তাঁর ধর্ম দেশনা ছিল অত্যন্ত মধুর এবং হৃদয়স্পর্শী। জাতকের বর্ণনায় বলা হয়েছে—“হস্তীরা যেমন বীণার সুরে মুগ্ধ হয়ে স্থির হয়ে থাকে, জম্বুদ্বীপের রাজারাও তেমনি বিদুর পণ্ডিতের মধুর ধর্মকথায় মুগ্ধ হয়ে রাজকার্য ভুলে তাঁর চরণে পড়ে থাকতেন।” তাঁর পাণ্ডিত্য কেবল শব্দশৈলী বা পাণ্ডিত্যের আস্ফালন ছিল না; তা ছিল সত্য ও শীল পালনের এক জীবন্ত প্রতীক। তিনি রাজাদের ক্রোধ দমন করতেন এবং প্রজাদের ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতেন।
চতুর্মুখ বিবাদ ও বিদুর পণ্ডিতের নিরপেক্ষ বিচার:
বিদুর পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যের প্রথম বড় পরিচয় পাওয়া যায় চার রাজার বিবাদের মীমাংসায়। দেবরাজ শত্রু, নাগরাজ বরুণ, সুবর্ণরাজ (গরুড়) এবং কৌরবরাজ ধনঞ্জয়—এই চারজনই শীল পালন ও উপোসথ ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিল যে, কার শীল সর্বশ্রেষ্ঠ? শত্রু বললেন খন্তি (ক্ষমা), নাগরাজ বললেন অক্রোধ, সুবর্ণরাজ বললেন অনির্ভরতা এবং ধনঞ্জয় বললেন শীলনিষ্ঠা। এই জটিল আধ্যাত্মিক প্রশ্নের সমাধানের জন্য তাঁরা বিদুর পণ্ডিতের শরণাপন্ন হলেন। বিদুর পণ্ডিত অত্যন্ত কুশলতার সাথে তাঁদের বিবাদ মীমাংসা করে দিলেন। তিনি বললেন, এই চারজন রাজার গুণাবলী আসলে একটি রথের চারটি চাকার মতো; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অর্থহীন। তাঁর এই নিরপেক্ষ ও গভীর অর্থপূর্ণ বিচারে তুষ্ট হয়ে চার রাজা তাঁকে বহুমূল্য মণি, দুকূল ও গবাদি পশু দিয়ে পূজা করলেন। এখানেই প্রমাণিত হয় যে, পণ্ডিত তিনিই যিনি বিরোধের মাঝে সমন্বয় সাধন করতে পারেন।
বিমলা দেবীর আকাঙ্ক্ষা: হৃদপিণ্ড না কি প্রজ্ঞা?
নাগরাজ বরুণের স্ত্রী বিমলা যখন শুনলেন যে বিদুর পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যের কারণে স্বয়ং নাগরাজ তাঁর মহামূল্যবান মণি বিদুরকে দান করেছেন, তখন তাঁর মনে বিদুর পণ্ডিতের ধর্মবাণী শোনার প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হলো। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করলেন ভিন্নভাবে। তিনি ‘অসুখ’ বা ব্যাধির ভান করে শয্যাশায়ী হলেন এবং দাবি করলেন— “বিদুর পণ্ডিতের হৃদয়-মাংস (হৃদপিণ্ড) না পেলে আমার মৃত্যু অনিবার্য।” আসলে অলঙ্কারিক অর্থে বিমলা দেবী বিদুর পণ্ডিতের ‘প্রজ্ঞা’ বা তাঁর হৃদয়ের অমীয় ধর্মবাণী ভক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যক্ষ সেনাপতি পূর্ণক বিষয়টিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলেন। নাগকন্যা ইরন্দতীর প্রেমে মগ্ন হয়ে পূর্ণক প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তিনি বিদুর পণ্ডিতের হৃদয়-মাংস নিয়ে আসবেন।
দ্যূতক্রীড়া ও বিদুর পণ্ডিতের স্থিতপ্রজ্ঞা:
পূর্ণক জানতেন রাজা ধনঞ্জয় দ্যূতক্রীড়ায় (পাশা খেলা) অত্যন্ত আসক্ত। তিনি এক মায়াবী মণি নিয়ে রাজার সাথে পাশা খেলায় মত্ত হলেন এবং কৌশলে রাজাকে পরাজিত করলেন। বাজি হিসেবে পূর্ণক চাইলেন রাজা ধনঞ্জয়ের শ্রেষ্ঠ সম্পদ— বিদুর পণ্ডিতকে। রাজা অত্যন্ত বিমর্ষ হলেন, কিন্তু প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে বিদুরকে পূর্ণকের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন। এই সংকটময় মুহূর্তে বিদুর পণ্ডিতের যে আচরণ দেখা যায়, তা-ই হলো প্রকৃত পাণ্ডিত্য। তিনি বিচলিত হলেন না, রাজার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না। তিনি রাজাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন—“রাজা হলেন বৃক্ষের মতো, আর অমাত্যরা হলো সেই বৃক্ষের ছায়া। বৃক্ষ থাকলে ছায়া আবার পাওয়া যাবে।” তিনি হাসিমুখে পূর্ণকের সাথে গমনের জন্য প্রস্তুত হলেন। এটি তাঁর সত্যনিষ্ঠা এবং কর্তব্যের প্রতি অবিচল থাকার চরম নিদর্শন।
পূর্ণকের নিষ্ঠুরতা ও বিদুরের প্রাণরক্ষাকারী দেশনা:
পূর্ণক বিদুর পণ্ডিতকে নিয়ে হিমালয়ের পথে যাত্রা করলেন। তিনি চেয়েছিলেন নির্জন স্থানে বিদুরকে হত্যা করে তাঁর হৃদপিণ্ড নিয়ে যেতে। তিনি বিদুরকে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, বৈভম্ভ বায়ুর ঝাপটা দিলেন, এমনকি রাক্ষসের বেশ ধরে ভয় দেখালেন। কিন্তু বিদুর পণ্ডিত হিমাদ্রি পর্বতের ন্যায় অটল হয়ে বসে ধ্যানে মগ্ন রইলেন। বিদুর পণ্ডিত পূর্ণককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন তুমি আমাকে মারতে চাও?” পূর্ণক যখন তাঁর হীন কামনার কথা ব্যক্ত করলেন, তখন বিদুর পণ্ডিত তাঁকে মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘সাধু নরধর্ম’ বা ‘সৎ মানুষের চারিত্রিক গুণাবলী’ সম্পর্কে দেশনা করলেন। তিনি চারটি মহৎ গুণের কথা বললেন:
১. যে ব্যক্তি কারো আশ্রয়ে থাকে, তার অনিষ্ট করা উচিত নয়।
২. অকৃতজ্ঞ হওয়া মহাপাপ।
৩. সত্যের পথ কখনও ত্যাগ করা উচিত নয়।
৪. কামনার বশবর্তী হয়ে অধর্ম করা অনুচিত।
বিদুর পণ্ডিতের এই অমোঘ সত্যবাণী পূর্ণকের অন্তরাকাশ উদ্ভাসিত করে দিল। পূর্ণকের হাতে উদ্যত খড়্গ খসে পড়ল। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি এক মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের ক্ষতি করতে যাচ্ছিলেন। বিদুর পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য এখানে একজন খুনিকেও সাধুতে রূপান্তরিত করল।
নাগভবনে পাণ্ডিত্যের বিজয়:
পূর্ণক বিদুরকে মুক্তি দিতে চাইলেন, কিন্তু বিদুর পণ্ডিত তাঁর পাণ্ডিত্যের দায়িত্ব পালনের জন্য স্বেচ্ছায় নাগভবনে যেতে চাইলেন। তিনি নাগরাজ বরুণ এবং রানী বিমলার সামনে উপস্থিত হলেন। বিদুর পণ্ডিত বুঝতে পারলেন বিমলা দেবীর প্রকৃত রোগ শারীরিক নয়, আধ্যাত্মিক। তিনি বিমলা দেবীকে পরম কারুণিক ভাষায় ধর্ম দেশনা করলেন। তাঁর দেশনা শুনে বিমলা দেবী এবং নাগরাজ উভয়েই তৃপ্ত হলেন। রানী বিমলা বুঝতে পারলেন যে বিদুরের পাণ্ডিত্যই হলো তাঁর ‘হৃদয়-মাংস’ যা মানুষকে অমরত্ব দান করে। বিদুর পণ্ডিত সেখানে ছয়দিন অবস্থান করে নাগলোককে ধর্মের আলোয় আলোকিত করলেন এবং পূর্ণকের সাথে নাগকন্যা ইরন্দতীর বিবাহের ব্যবস্থা করে এক সামাজিক সমন্বয় সাধন করলেন।
রাজা ধনঞ্জয়ের স্বপ্ন ও বিদুরের প্রত্যাবর্তন:
এদিকে রাজা ধনঞ্জয় অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে বিদুর পণ্ডিতের জন্য বিলাপ করছিলেন। তিনি স্বপ্নে একটি কল্পবৃক্ষ দেখেছিলেন যা কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পুনরায় তা ফিরে এসেছিল। বিদুর পণ্ডিত যখন পূর্ণকের মায়াবী অশ্বে চড়ে পুনরায় ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন, তখন সমগ্র কুরুরাজ্য উৎসবে মেতে উঠল। বিদুর পণ্ডিত রাজাকে নাগলোকের মণি উপহার দিলেন এবং রাজাকে ধর্মের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন।
উপসংহার:
বিদুর পণ্ডিতের জাতক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত পাণ্ডিত্য কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়। বিদুর পণ্ডিতের চরিত্র বিশ্লেষণে তাঁর পাণ্ডিত্যের কয়েকটি স্তম্ভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. নির্ভীকতা: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি সত্য বলতে দ্বিধা করেননি।
২. অক্রোধ: যারা তাঁর প্রাণ নিতে চেয়েছিল, তাদের প্রতিও তিনি ছিলেন করুণাময়।
৩. বিচক্ষণতা: চার রাজার বিবাদ মীমাংসা তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়।
৪. সদুপদেশ: তিনি জানতেন কখন কাকে কোন উপদেশ দিলে তাঁর চিত্ত শুদ্ধ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিদুর পণ্ডিত ছিলেন প্রজ্ঞার এক মহাসমুদ্র। তাঁর উপদেশানুসারে রাজা ধনঞ্জয় এবং কুরুরাজ্যবাসী দীর্ঘকাল সুখে শান্তিতে বসবাস করেছিলেন। জাতক সাহিত্যের এই মহান চরিত্রটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে— *“প্রজ্ঞাই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা জীবন ও মৃত্যুর সকল ঝড়কে প্রতিহত করতে সক্ষম।”* বিদুর পণ্ডিত রূপী বোধিসত্ত্ব তাঁর পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে কেবল নিজের প্রাণ রক্ষা করেননি, বরং এক হিংস্র যক্ষকে এবং এক মোহগ্রস্ত নাগরাজ পরিবারকে সত্যের আলোয় আলোকিত করেছিলেন। তাঁর এই পাণ্ডিত্যই হলো প্রকৃত ‘হৃদয়-মাংস’, যা বৌদ্ধ দর্শনের চিরন্তন শিক্ষা।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।

No comments