রাণী কালিন্দী: রাজ্যহারা হওয়ার দায়, নাকি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক মহীয়সী নারী?
চাকমা সমাজে রাণী কালিন্দীকে নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে—“রাণী কালিন্দীর কারণেই চাকমা জাতি রাজ্যহারা হয়েছে।” এমনকি তাঁর কোনো কোনো সিদ্ধান্তকে চাকমা রাজ্যের অধঃপতনের মূল কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ইতিহাসকে যদি কেবল প্রচলিত জনশ্রুতি বা একপাক্ষিক অভিযোগের ভিত্তিতে না দেখে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি এবং রাণী কালিন্দীর ভূমিকার আলোকে বিচার করা হয়, তাহলে এই ধারণাটি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের মহীয়সী নারীদের বীরত্বগাথা কিংবা সমাজে তাঁদের অবদানের কথা বললে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে নবাব ফয়জুন্নেসা ও বেগম রোকেয়ার মতো নারীদের নাম। অথচ তাঁদেরও আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে জন্ম নিয়ে এক নারী যে দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন, তাঁর কথা অনেকের কাছেই আজও অজানা। তিনি রাণী কালিন্দী। উনিশ শতকের প্রথমদিকে রাস্তাঘাটহীন দুর্গম পার্বত্য এলাকার কুদুকছড়ির একটি সাধারণ চাকমা জুমিয়া পরিবারে কালাবি চাকমার জন্ম। পরবর্তীতে চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় এবং তিনি ‘রাণী কালিন্দী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। সাধারণ পরিবারে বেড়ে উঠলেও কালিন্দী ছিলেন স্বশিক্ষিত। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে তিনি রাজপরিবারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হন। তাঁর অবদান কেবল রাজনীতি কিংবা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে রাণী কালিন্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর উদ্যোগে চট্টগ্রামের রাজানগরে মহামুনি বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে ‘মহামুনি মেলা’র প্রচলন ঘটে। একই সঙ্গে ‘বৌদ্ধ রঞ্জিকা’ প্রকাশেও তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু বৌদ্ধ ধর্ম নয়, হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধাশীল মনোভাব ছিল। রাজানগরে হিন্দুদের মন্দির ও মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজভান্ডার থেকে ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন বলে প্রবন্ধটিতে উল্লেখ রয়েছে। এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাবই তাঁকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল বলে লেখক মনে করেন।
উত্তরাধিকার প্রশ্নে রাণী কালিন্দী
চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁ প্রায় ২০ বছর রাজত্ব করার পর ১৮৩২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি অপুত্রক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে রাজপরিবারে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ইংরেজ কোম্পানি তৃতীয় রাণীর একমাত্র কন্যা মেনকা ওরফে চিকনবীকে উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজ্যভার দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু প্রথমা রাণী কালিন্দীর আপত্তির কারণে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয় এবং ইংরেজ কোম্পানির পক্ষ থেকে শুকলাল দেওয়ানকে রাজ্যের ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৮৩৭ সালে রাণী কালিন্দী ইংরেজ কোম্পানির কাছ থেকে দুই বছরের জন্য রাজ্য ইজারা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পর ১৮৪৪ সালে ইংরেজ কোম্পানি তাঁকে স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ, ১৮৪৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এর আগেই ১৮৩২ সাল থেকে রাজ্য পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৪৪ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক তিনি চাকমা রাজ্য শাসন করেন।
ব্রিটিশ আধিপত্য ও রাণী কালিন্দীর অবস্থান
রাণী কালিন্দীর শাসনকাল পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়েই ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলের ওপর তাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে শুরু করে। ১৮৬০ সালের আগে ব্রিটিশরা চট্টগ্রাম থেকেই দুর্গম পার্বত্য এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিভিন্ন সময়ে সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়োগ করা হয়। ১৮৬৬ সাল থেকে ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইন নিয়মিত শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৬৯ সালের ১ জানুয়ারি তিনি প্রশাসনিক সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনা থেকে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করেন। ইলিরা দেওয়ানের বর্ণনা অনুযায়ী, লুইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে ব্রিটিশ কর্তৃত্বকে আরও স্থায়ী ও সুসংহত করা। আর এখানেই রাণী কালিন্দীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। লুইন প্রথম থেকেই রাণী কালিন্দীর সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। একজন বিধবা ও নারী কীভাবে রাজ্যের শাসন পরিচালনা করতে পারেন—এমন ঔপনিবেশিক ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর অবস্থানের মধ্যে ছিল বলে প্রবন্ধটিতে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রাণী কালিন্দী তাঁর বুদ্ধিমত্তা, নিষ্ঠা, সদালাপ ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনায় নিজের সক্ষমতার পরিচয় দেন।
রাজ্য ভাগের ষড়যন্ত্র?
প্রবন্ধটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—ব্রিটিশ প্রশাসন রাণী কালিন্দীর কর্তৃত্ব দুর্বল করার নানা চেষ্টা করেছিল। পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন উপত্যকাভূমি প্রতিপত্তিশালী দেওয়ানদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার মাধ্যমে রাজ্যের ভূমি ও কর্তৃত্বের একটি বড় অংশ রাণীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে লেখক উল্লেখ করেন। কিন্তু দেওয়ানরা রাণীর প্রতি আনুগত্যের কারণে সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি বলে প্রবন্ধটিতে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে চাকমা রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৮১ সালের ১ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাকমা, বোমাং ও মং—এই তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ১৮৮১ সালের সার্কেল ব্যবস্থা রাণী কালিন্দীর মৃত্যুর আট বছর পর কার্যকর হয়। তাই এই প্রশাসনিক বিভাজনের সম্পূর্ণ দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিকভাবে সরলীকৃত ব্যাখ্যা হতে পারে। বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও ঔপনিবেশিক স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
লুইনের সঙ্গে সংঘাত
রাণী কালিন্দীর সঙ্গে ক্যাপ্টেন লুইনের সম্পর্ক ক্রমেই বৈরী হয়ে ওঠে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, লুইন রাণীকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের উদ্যোগ নেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় একজন নারী শাসকের জন্য কোনো পুরুষ ব্রিটিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করা ছিল সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। রাণী সেই প্রস্তাবে সম্মত হননি। এরপর লুইনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আরও তীব্র হয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। এমনকি কয়েকশ সৈন্য নিয়ে লুইন রাঙ্গুনিয়ায় এসে চাকমা রাজবাড়িতে আক্রমণের চেষ্টা করেছিলেন এবং স্থানীয় জনগণ—চাকমা, হিন্দু ও মুসলমান নির্বিশেষে—তাকে প্রতিহত করে পিছু হটিয়ে দেয় বলে প্রবন্ধটিতে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনা সত্য হলে এটি রাণী কালিন্দীর জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ কোনো শাসকের প্রতি সাধারণ মানুষের আনুগত্য কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে তৈরি হয় না; এর সঙ্গে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ন্যায়বোধ ও ব্যক্তিত্বেরও সম্পর্ক থাকে। তাহলে কি রাণী কালিন্দীর কারণেই চাকমারা রাজ্যহারা? এখানেই মূল প্রশ্নটি।
রাণী কালিন্দীর কোনো সিদ্ধান্তের ভুল-ত্রুটি ছিল কি না, তা ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয় হতে পারে। একজন শাসক হিসেবে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নিখুঁত বলে ধরে নেওয়ারও কারণ নেই। কিন্তু “রাণী কালিন্দীর ভুলের কারণেই চাকমা জাতি রাজ্যহারা”—এই বক্তব্যকে একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে আরও বিস্তৃত প্রমাণ প্রয়োজন। কারণ তাঁর শাসনামলেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের প্রশাসনিক, ভূমি ও রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বিস্তৃত করছিল। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং ভূমি নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াকে বাদ দিয়ে কেবল একজন নারী শাসকের সিদ্ধান্তকে রাজ্য হারানোর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়। বরং রাণী কালিন্দীর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা হলো—তিনি এমন এক সময়ে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন, যখন একটি ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি রাজ্য ক্রমবর্ধমান ঔপনিবেশিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছিল। তিনি নিজের কর্তৃত্ব ও রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন—এমন ব্যাখ্যারও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
নারী নেতৃত্বের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
রাণী কালিন্দীর আরেকটি বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো—তিনি চাকমা রাজপরিবারের দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার বাইরে এসে একজন নারী হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। প্রায় তিন দশক তাঁর শাসনকাল প্রমাণ করে যে উনিশ শতকের রক্ষণশীল পাহাড়ি সমাজেও একজন নারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে এসে দীর্ঘদিন প্রশাসন পরিচালনা করতে সক্ষম ছিলেন। তাঁর সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজ্য পরিচালনার সক্ষমতা তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে পরিণত করেছে।১৮৭৩ সালে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর রাজপ্রাসাদে রাণী কালিন্দীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ শাসনপর্বের অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
রাণী কালিন্দীকে ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—তা নির্ভর করবে আমরা ইতিহাসকে কীভাবে দেখি তার ওপর। তাঁকে যদি শুধু ‘চাকমা রাজ্য হারানোর জন্য দায়ী নারী’ হিসেবে দেখি, তাহলে তাঁর জীবনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সামাজিক অবদান এবং ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে। আবার তাঁকে সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে একজন মহীয়সী শাসক হিসেবে দেখাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। তাই প্রয়োজন দোষারোপ নয়, দলিলনির্ভর পুনর্মূল্যায়ন। রাণী কালিন্দীর ইতিহাস আমাদের সামনে বরং একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়—**চাকমা রাজ্যের পতনের জন্য কি একজন নারীকে দায়ী করা সহজ বলে তাঁকেই দায়ী করা হয়েছে, নাকি তাঁর সময়ের বৃহত্তর ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক বাস্তবতাই ছিল রাজ্য ও ভূমির ওপর কর্তৃত্ব হারানোর প্রধান কারণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে লোকমুখে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সমকালীন ব্রিটিশ নথি, চাকমা রাজপরিবারের দলিল, ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত রেকর্ড এবং স্থানীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিকে পাশাপাশি রেখে গবেষণা করা প্রয়োজন।
সূত্র: ইলিরা দেওয়ান, জুম জার্নাল।

No comments