অভিধর্ম পিটকের সপ্তগ্রন্থের তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
বৌদ্ধ দর্শনের সুগভীর অরণ্যে ‘অভিধর্ম পিটক’ হলো সেই আলোকবর্তিকা, যা সত্তার গূঢ়তম রহস্যকে উন্মোচিত করে। ‘অভি’ উপসর্গের সাথে ‘ধর্ম’ শব্দের মিলনে গঠিত এই শব্দটির অর্থ হলো— ‘অতিরিক্ত ধর্ম’, ‘বিশিষ্ট ধর্ম’ বা ‘উচ্চতর ধর্ম’। আচার্য বুদ্ধঘোষের ভাষায়— *“ধম্মাতিরেক ধম্ম বিসেসেন অভিধম্মো”*। অর্থাৎ, সূত্র পিটকে যা লৌকিক ও অলঙ্কারিক ভাষায় বর্ণিত হয়েছে, অভিধর্ম পিটকে তারই বিশ্লেষণাত্মক, দার্শনিক এবং পরমার্থিক রূপায়ণ ঘটেছে।
সূত্র পিটকের দেশনা ছিল অনেকটা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বা গল্পের মতো, কিন্তু অভিধর্ম হলো সেই ওষুধের রাসায়নিক বিশ্লেষণ। যেখানে সূত্র পিটকে ‘আমি’, ‘তুমি’ বা ‘প্রাণী’র কথা বলা হয়েছে, অভিধর্ম সেখানে সেই মিথ্যে অবয়ব ভেঙে চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ— এই চার পরমার্থ সত্যের (Paramattha Sacca) অবতারণা করেছে। নিম্নে অভিধর্ম পিটকের অন্তর্গত সপ্তগ্রন্থের একটি তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
১. ধম্মসঙ্গণি:
‘ধম্মসঙ্গণি’ শব্দের অর্থ হলো ধর্মের সংকলন বা গণনা। এটি অভিধর্ম পিটকের প্রবেশদ্বার। যদি বৌদ্ধ দর্শনকে একটি মহাসমুদ্র কল্পনা করা হয়, তবে ধম্মসঙ্গণি হলো সেই সমুদ্রের প্রতিটি জলকণার রাসায়নিক বিশ্লেষণ।
এই গ্রন্থে মূলত কুশল, অকুশল এবং অব্যাকৃত— এই তিন প্রকার ধর্মের বিন্যাস করা হয়েছে। এর প্রধান আলোচনার বিষয় হলো চিত্ত (Mind) এবং চৈতসিক (Mental Factors)। চিত্ত ও চৈতসিকের যে ৫২টি উপকরণ রয়েছে, তাদের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে কীভাবে ৮৯ বা ১২১ প্রকার চিত্ত উৎপন্ন হয়, তার নিখুঁত গাণিতিক ছক এখানে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রূপ বা জড় পদার্থের (Matter) ২৮টি প্রকারভেদও এখানে আলোচিত। তথাগত বুদ্ধের প্রজ্ঞায় জগত কোনো অখণ্ড সত্তা নয়, বরং তা কতগুলো গুণের প্রবাহ। ধম্মসঙ্গণি আমাদের শেখায় যে, ‘আমি’ বলে কেউ নেই, আছে কেবল লহমায় লহমায় বদলে যাওয়া কতগুলো মানসিক ও শারীরিক ধর্মের স্পন্দন।
২. বিভঙ্গ:
‘বিভঙ্গ’ শব্দের অর্থ হলো বিভাগ বা বিশ্লেষণ। ধম্মসঙ্গণিতে যে বিষয়গুলো সংক্ষেপে বলা হয়েছে, বিভঙ্গে সেগুলোকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে স্থাপন করে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
এই গ্রন্থটি ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে স্কন্ধ, আয়তন, ধাতু, আর্য সত্য, প্রতীত্যসমুৎপাদ এবং অষ্টাঙ্গিক মার্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। বিভঙ্গের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর আলোচনার ত্রিমাত্রিক পদ্ধতি— ১. সূত্র ভজনীয় (সহজ ব্যাখ্যা), ২. অভিধর্ম ভজনীয় (দার্শনিক ব্যাখ্যা) এবং ৩. পঞ্ঞা পুচ্ছক (প্রশ্নোত্তর)। বিভঙ্গ যেন এক প্রজ্ঞার দর্পণ, যা আমাদের অস্তিত্বের পঞ্চস্কন্ধকে (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান) খণ্ড খণ্ড করে দেখায় যে, এর কোনো অংশই চিরস্থায়ী বা আত্মা নয়।
৩. ধাতুকথা:
ধাতুকথা হলো অভিধর্ম পিটকের ক্ষুদ্রতম গ্রন্থ, কিন্তু এর দার্শনিক গভীরতা অসীম। এর মূল উপজীব্য হলো ১৮টি ধাতু, ১২টি আয়তন এবং ৫টি স্কন্ধের পারস্পরিক সম্পর্ক।এই গ্রন্থটি ১৪টি পদ্ধতিতে ধর্মসমূহের শ্রেণীকরণ করে। এর প্রধান তিনটি দিক হলো— সংগৃহীত (অন্তর্ভুক্ত), সম্প্রযুক্ত (যুক্ত) এবং বিপ্রযুক্ত (বিযুক্ত)। এটি আমাদের দেখায় যে, আমাদের অনুভূতিগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি অলীক ‘সত্তা’র ভ্রম তৈরি করে। ধাতুকথা পাঠ করলে মানুষের মনে এই বোধ জাগ্রত হয় যে—
“দুক্খমেব হি ন কোচি দুক্খিতো,
কারকো ন কিরিয়া ব বিজ্জতি।”
(অর্থাৎ: দুঃখ আছে কিন্তু দুঃখী কেউ নেই, কর্ম আছে কিন্তু তার কোনো কর্তা নেই।)
৪. পুগ্গল পঞ্ঞত্তি:
অভিধর্মের অন্যান্য গ্রন্থ যেখানে নৈর্ব্যক্তিক (Impersonal), পুগ্গল পঞ্ঞত্তি সেখানে কিছুটা ব্যতিক্রম। ‘পুগ্গল’ মানে ব্যক্তি এবং ‘পঞ্ঞত্তি’ মানে প্রজ্ঞাপন বা পরিচয়। এটি মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক স্তরের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিদের শ্রেণীকরণ করে। যদিও পরমার্থ সত্যে কোনো ‘ব্যক্তি’ নেই, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে মানুষকে চেনার জন্য কিছু সংজ্ঞার প্রয়োজন হয়। এই গ্রন্থে একবিধ পুদ্গল থেকে শুরু করে দশবিধ পুদ্গলের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কে স্রোতাপন্ন, কে অনাগামী, কে সম্যক সম্বুদ্ধ— এই শ্রেণীবিভাগ এখানে পাওয়া যায়। এটি আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য একটি দিকনির্ণয়কারী মানচিত্রের মতো কাজ করে।
৫. কথাবত্থু:
‘কথাবত্থু’ বৌদ্ধ ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক দলিল। এটিই একমাত্র গ্রন্থ যার রচয়িতা হিসেবে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম (মোদগলিপুত্র তিষ্য স্থবির) পালি সাহিত্যে স্বীকৃত। সম্রাট অশোকের সময় তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির প্রাক্কালে এটি রচিত হয়। তৎকালীন বৌদ্ধ সংঘে যে সমস্ত ভিন্নমতাবলম্বী ও ভ্রান্ত ধারণা প্রবেশ করেছিল, সেগুলোকে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে খণ্ডন করাই ছিল এই গ্রন্থের লক্ষ্য। এতে প্রায় ২১৬টি বিতর্কিত বিষয় আলোচিত হয়েছে। থেরবাদ বা বিভজ্যবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার জন্য এই গ্রন্থটি একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে কাজ করেছে। এটি বৌদ্ধ ন্যায়ন্যায় বা যুক্তিশাস্ত্রের এক অনন্য নিদর্শন।
৬. যমক:
‘যমক’ শব্দের অর্থ হলো জোড়া বা যুগল। এই গ্রন্থের নাম থেকেই এর আলোচনা পদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়। এটি অত্যন্ত জটিল ও গাণিতিক যুক্তিনির্ভর একটি গ্রন্থ। যমক গ্রন্থে প্রতিটি প্রশ্ন ও উত্তরকে যুগলভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন— “যেখানে রূপস্কন্ধ উৎপন্ন হয়, সেখানে কি বেদনাস্কন্ধও উৎপন্ন হয়?” আবার এর বিপরীত প্রশ্ন— “যেখানে বেদনাস্কন্ধ উৎপন্ন হয়, সেখানে কি রূপস্কন্ধও উৎপন্ন হয়?” এটি মূলত পালি পরিভাষাগুলোর সীমা ও প্রয়োগ নির্ধারণ করে। দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থটি পাঠ করলে শিক্ষার্থীর বিচারবুদ্ধি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রখর হয়। এটি যেন এক প্রকার মানসিক ব্যায়াম যা প্রজ্ঞাকে শাণিত করে।
৭. পট্ঠান:
অভিধর্ম পিটকের সর্বশেষ এবং সর্ববৃহৎ গ্রন্থ হলো ‘পট্ঠান’। এর আয়তন ও গুরুত্বের কারণে একে ‘মহাপকরণ’ (Great Book) বলা হয়। বৌদ্ধ প্রজ্ঞার চরম শিখর হলো এই পট্ঠান। পট্ঠান শব্দের অর্থ হলো প্রধান কারণ বা প্রত্যয়। এই গ্রন্থে ২৪ প্রকার প্রত্যয় বা কার্যকারণ সম্পর্কের (Conditions) বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। জগত কেবল কতগুলো উপাদানের সমষ্টি নয়, সেই উপাদানগুলো কীভাবে একে অপরের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে— তা-ই পট্ঠানের বিষয়। যেমন— একটি প্রদীপ জ্বলতে গেলে তেল, সলতে এবং আগুন— প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের যে সম্পর্ক, জগত ও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তও তেমনই ২৪টি সম্পর্কের জালে আবদ্ধ। পট্ঠান আমাদের শেখায় যে, জগত একটি ‘কারণ-পরম্পরা’ (Chain of Causality)। এর মাধ্যমেই বৌদ্ধ দর্শনের ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’ পূর্ণতা লাভ করেছে।
উপসংহার:
অভিধর্ম পিটকের এই সাতটি গ্রন্থ কেবল কতগুলো শুষ্ক দার্শনিক তত্ত্ব নয়। এটি হলো মানব মনের অন্ধকার দূর করার এক মহাজাগতিক ব্যবস্থাপত্র। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান পদার্থের পরমাণু নিয়ে গবেষণা করে, তথাগত বুদ্ধের অভিধর্ম সেখানে মনের পরমাণু বা ‘চিত্ত-ক্ষণ’ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। সাগর যেমন অতলস্পর্শী হয়েও স্থির, অভিধর্মও তেমনি গভীর হয়েও শান্ত। এই সপ্তগ্রন্থের নির্যাস হলো— মোহমুক্ত হওয়া। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে তার ক্রোধ, লোভ বা অহংকার কেবল কতগুলো অস্থায়ী ধর্মের সমষ্টি এবং এর পেছনে কোনো স্থায়ী ‘আমি’ নেই, তখনই তার মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়।
পরিশেষে, ধম্মপদের সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়—
“মনোপুব্বঙ্গমা ধম্মা মনোসেট্ঠা মনোময়া”
(অর্থাৎ: সকল ধর্ম বা মানসিক অবস্থার মূলে রয়েছে মন, মনই শ্রেষ্ঠ এবং সবকিছু মন দিয়েই তৈরি।) অভিধর্ম পিটক সেই মনকে জয় করার এবং অবিদ্যা থেকে পরম প্রজ্ঞার আলোকে উত্তরণের এক ধ্রুপদী মহাকাব্য। এটি পাঠের মাধ্যমে মানুষ কেবল বৌদ্ধ দর্শনকে চেনে না, বরং নিজেকে চেনার এক অনন্য শক্তি লাভ করে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে পরম শান্তি বা ‘নির্বাণ’-এর দুয়ারে পৌঁছে দেয়।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।
No comments