পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি শব্দের অর্থ ও পুদ্গলের প্রকারভেদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
বৌদ্ধ দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ হলো ত্রিপিটক। এই ত্রিপিটকের তৃতীয় বিভাগ ‘অভিধর্ম পিটক’। অভিধর্ম পিটকের সাতটি গ্রন্থের মধ্যে চতুর্থ গ্রন্থটি হলো ‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’ (Puggala Paññatti)। এই গ্রন্থটি মূলত বৌদ্ধ মনস্তত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান অনুযায়ী মানুষের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করে। নিচে পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি শব্দের অর্থ, এর তাৎপর্য এবং পুদ্গলের বিভিন্ন প্রকারভেদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ
‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’ শব্দটি দুটি স্বতন্ত্র শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: ‘পুদ্গল’ (Puggala) এবং ‘প্রজ্ঞপ্তি’ (Paññatti)।
পুদ্গল (Puggala):
সাধারণ বা ব্যবহারিক সত্য (Sammuti Sacca) অনুসারে ‘পুদ্গল’ বলতে ব্যক্তি, পুরুষ, সত্তা, জীব বা আত্মাকে বোঝায়। তবে বৌদ্ধ দর্শনের পরমার্থ সত্য (Paramattha Sacca) অনুযায়ী, ‘পুদ্গল’ বা স্থায়ী কোনো ‘আমি’ বা ‘আত্মা’র অস্তিত্ব নেই। মানুষ মূলত পাঁচটি স্কন্ধের (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান) সমষ্টি এবং একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল চিত্ত-সন্ততি মাত্র। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে পারস্পরিক বিনিময়ের সুবিধার্থে এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের পর্যায়গুলো বোঝানোর জন্য ‘ব্যক্তি’ বা ‘পুদ্গল’ শব্দটির প্রয়োগ অপরিহার্য। তাই পুদ্গল বলতে এখানে বিশেষ বিশেষ গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ বা আধ্যাত্মিক স্তরে অবস্থানরত সাধককে বোঝানো হয়েছে।
প্রজ্ঞপ্তি (Paññatti):
‘প্রজ্ঞপ্তি’ শব্দের অর্থ হলো প্রজ্ঞাপনা, জ্ঞাপন করা, প্রকাশ করা, নির্দেশ করা বা সংজ্ঞা প্রদান করা। কোনো বস্তুর বা বিষয়ের নাম, রূপ বা স্বরূপকে যখন সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়, তখন তাকে প্রজ্ঞপ্তি বলা হয়। বৌদ্ধ পরিভাষায় এটি কোনো বিষয়কে যথার্থভাবে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তির সমন্বিত অর্থ:
সুতরাং, ‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’ বলতে এমন এক শাস্ত্র বা বর্ণনাকে বোঝায়, যেখানে ব্যক্তি বিশেষের আধ্যাত্মিক অবস্থা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রজ্ঞার স্তর অনুযায়ী তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় প্রদান করা হয়েছে। সহজ কথায়, এটি ‘ব্যক্তির শ্রেণিবিভাগ’ বা ‘মানব চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ’।
২. গ্রন্থের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব:
অভিধর্ম পিটকের অন্যান্য গ্রন্থ যেমন—ধম্মসঙ্গণি বা বিভঙ্গ-এ যেভাবে চিত্ত, চৈতসিক বা জড়বস্তুর বিশ্লেষণ করা হয়েছে, পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি সেদিক থেকে কিছুটা ভিন্ন। এর বর্ণনা ভঙ্গি অনেকটা সূত্র পিটকের ‘অঙ্গুত্তর নিকায়’ বা ‘সংগীতি সুত্ত’-এর মতো। বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত ড. রীস ডেভিডস এবং অন্যান্য গবেষকদের মতে, এটি অভিধর্ম পিটকের প্রাচীনতম গ্রন্থগুলোর একটি। আচার্য বুদ্ধঘোষের মতে, গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং ত্ৰয়স্ত্রিংশ দেবলোকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব দেশনা করেছিলেন। বৌদ্ধ সাধনার পথে একজন সাধক কোন স্তরে আছেন এবং তার অগ্রগতির জন্য কী প্রয়োজন, তা বোঝার জন্য এই গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম।
৩. প্রজ্ঞপ্তির প্রকারভেদ:
আচার্য বুদ্ধঘোষের মতে, প্রজ্ঞপ্তি প্রধানত ছয় প্রকার হতে পারে। পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি এই ছয়টির মধ্যে অন্যতম। যথা:
১. স্কন্ধ প্রজ্ঞপ্তি: রূপ, বেদনা ইত্যাদি পঞ্চস্কন্ধের বর্ণনা।
২. আয়তন প্রজ্ঞপ্তি: চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ১২টি আয়তনের বর্ণনা।
৩. ধাতু প্রজ্ঞপ্তি: ১৮টি ধাতুর বর্ণনা।
৪. সত্য প্রজ্ঞপ্তি: চতুরার্য সত্যের বর্ণনা।
৫. ইন্দ্রিয় প্রজ্ঞপ্তি: ২২টি ইন্দ্রিয়ের বর্ণনা।
৬. পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি: বিভিন্ন প্রকার ব্যক্তির বর্ণনা।
৪. পুদ্গলের প্রকারভেদ ও দশটি অধ্যায়:
‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’ গ্রন্থে পুদ্গল বা ব্যক্তিদের মোট ১০টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। একে বলা হয় ‘মাতিকা’। এখানে ১ প্রকার পুদ্গল থেকে শুরু করে ১০ প্রকার পুদ্গলের বর্ণনা রয়েছে। নিচে সংক্ষেপে এই বিন্যাসটি তুলে ধরা হলো:
একক নির্দেশ: ১ প্রকার পুদ্গলের বর্ণনা।
দ্বিক নির্দেশ: ২ প্রকার পুদ্গলের বর্ণনা।
ত্রিক নির্দেশ: ৩ প্রকার পুদ্গলের বর্ণনা।
চতুষ্ক নির্দেশ: ৪ প্রকার পুদ্গলের বর্ণনা।
--- এভাবে দশম নির্দেশ পর্যন্ত।
৫. ৫০ প্রকার পুদ্গলের বিস্তারিত তালিকা ও আলোচনা:
আপনার প্রদত্ত তালিকায় যে ৫০ প্রকার পুদ্গলের উল্লেখ রয়েছে, বৌদ্ধ দর্শনে তাদের বিশেষ বিশেষ আধ্যাত্মিক ও মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। নিচে এই গুরুত্বপূর্ণ পুদ্গলদের স্বরূপ আলোচনা করা হলো:
(ক) মুক্ত ও সাধনা সম্পর্কিত পুদ্গল:
১. কাল বিমুক্ত: যারা নির্দিষ্ট সময়ে সাধনার মাধ্যমে বিমুক্তি লাভ করেন।
২. অকাল বিমুক্ত: যারা যেকোনো সময়ে বিমুক্তি বা অর্হত্ত্ব লাভ করতে পারেন।
৩. কুপ্যধর্মী: যাদের অর্জিত আধ্যাত্মিক স্তর বা ধ্যান বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৪. অকুপ্যধর্মী: যাদের আধ্যাত্মিক অর্জত বা স্তর অটল থাকে, যা কখনো বিনষ্ট হয় না (যেমন: অর্হৎ)।
৫. পরিহানীয় ধর্মী: যারা অর্জিত স্তর থেকে বিচ্যুত হতে পারেন।
৬. অপরিহানীয় ধর্মী: যারা আধ্যাত্মিক পতন থেকে মুক্ত।
(খ) পৃথকজন ও আর্য পুদ্গল:
৭. পৃথকজন (Putthujjana): সাধারণ মানুষ যারা কামনাবাসনায় মত্ত এবং আর্য মার্গে প্রবেশ করেনি।
৮. গোত্রভূ: যিনি সাধারণ অবস্থা (পৃথকজন) ত্যাগ করে আর্য মার্গে প্রবেশের সন্ধিক্ষণে আছেন।
৯. আর্য (Ariya): যারা স্রোতাপন্ন থেকে অর্হৎ পর্যন্ত যেকোনো একটি স্তরে উন্নীত হয়েছেন।
১০. অনার্য: যারা আধ্যাত্মিক মার্গ লাভ করেননি।
(গ) প্রজ্ঞা ও বুদ্ধত্ব সম্পর্কিত:
১১. সম্যক সম্বুদ্ধ (Samma Sambuddha): যিনি গুরুর সাহায্য ছাড়াই পরম জ্ঞান লাভ করেন এবং জগতকে সত্যের পথ দেখান।
১২. প্রত্যেক বুদ্ধ (Pacceka Buddha): যিনি নিজে জ্ঞান লাভ করেন কিন্তু অন্যকে সেই পথ শিক্ষা দিতে পারেন না।
১৩. ত্রিবিদ্যা: যারা তিন প্রকার উচ্চতর জ্ঞান (পূর্বজন্মের স্মৃতি, দিব্যচক্ষু এবং আসবক্ষয় জ্ঞান) লাভ করেছেন।
১৪. ষড়ভিজ্ঞ: যারা ছয় প্রকার অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।
(ঘ) আর্য মার্গের চারটি স্তর ও ফল:
বৌদ্ধ সাধনায় চারটি প্রধান স্তর রয়েছে, এবং প্রতিটি স্তরের দুটি দিক থাকে—মার্গ এবং ফল। এখান থেকেই বিভিন্ন পুদ্গলের উৎপত্তি:
১৫. স্রোতাপন্ন: যিনি নির্বাণের স্রোতে প্রথম অবগাহন করেছেন। তার সাত জন্মের বেশি পুনর্জন্ম হয় না।
১৬. সকৃদাগামী: যিনি মাত্র একবার এই কামলোকে ফিরে আসবেন।
১৭. অনাগামী: যিনি আর এই কামলোকে ফিরে আসবেন না, শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে জন্ম নিয়ে সেখান থেকেই নির্বাণ লাভ করবেন।
১৮. অর্হৎ: যিনি সকল ক্লেশ বিনাশ করেছেন এবং পূর্ণ মুক্তি লাভ করেছেন।
(ঙ) অনাগামী পুদ্গলের প্রকারভেদ:
অনাগামী ব্যক্তিদের আবার পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে (তালিকায় ৩৭-৪৬ নং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত):
অন্তরাপরিনির্বায়ী: যিনি আয়ুর মাঝপথেই নির্বাণ লাভ করেন।
উপহত্যনির্বায়ী: যিনি আয়ুর শেষ দিকে নির্বাণ লাভ করেন।
অসংস্কার পরিনির্বায়ী: যিনি বিনা পরিশ্রমে বা সহজে নির্বাণ লাভ করেন।
সসংস্কার পরিনির্বায়ী: যিনি কঠোর সাধনার মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করেন।
উদ্ধস্রোত অকনিষ্ঠগামী: যিনি ব্রহ্মলোকের উচ্চতর স্তরে গিয়ে নির্বাণ লাভ করেন।
(চ) বিমুক্তি ও দৃষ্টির ভিত্তিতে পুদ্গল:
১৯. উভয়ভাগ বিমুক্ত: যারা রূপধ্যান ও অরূপধ্যান—উভয় মাধ্যমেই বিমুক্ত হয়েছেন।
২০. প্রজ্ঞা বিমুক্ত: যারা প্রজ্ঞার মাধ্যমে আসব বা ক্লেশ ক্ষয় করেছেন।
২১. কায়দর্শী: যারা নিজেদের অভিজ্ঞতায় নির্বাণ শান্তি অনুভব করেছেন।
২২. দৃষ্টিপ্রাপ্ত: যারা সম্যক দৃষ্টির মাধ্যমে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
২৩. শ্রদ্ধা বিমুক্ত: যারা প্রগাঢ় শ্রদ্ধার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেছেন।
৬. পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তির দার্শনিক বিচার:
অভিধর্ম পিটকের অন্যান্য গ্রন্থে ধর্ম বা পরমার্থ সত্য (চিত্ত, চৈতসিক) নিয়ে বিচার করা হলেও ‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’তে কেন ব্যক্তির আলোচনা করা হলো—তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তবে এর একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে।
১. ব্যবহারিক প্রয়োজন: বৌদ্ধ ধর্ম কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি প্রয়োগিক। সাধনার পথে কোন ব্যক্তি কোন অবস্থায় আছেন, তা নির্ধারণ করা না গেলে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা বলা কঠিন।
২. মানসিক গঠন: প্রত্যেকটি ‘পুদ্গল’ আসলে এক একটি বিশেষ মানসিক গঠনের নাম। যেমন ‘অকুতোভয়’ পুদ্গল মানে এমন এক ব্যক্তি যার চিত্ত ভয়শূন্য হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তির নাম দিয়ে আসলে কিছু গুণের সমষ্টিকেই নির্দেশ করা হয়েছে।
৩. বিবর্তনের ধারা: এই গ্রন্থটি দেখায় কীভাবে একজন ‘পৃথকজন’ (সাধারণ মানুষ) নিজের কর্ম ও সাধনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘গোত্রভূ’ এবং শেষে ‘সম্যক সম্বুদ্ধ’ বা ‘অর্হৎ’ স্তরে উন্নীত হতে পারেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, ‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’ বৌদ্ধ মনস্তত্ত্বের একটি অসাধারণ রূপরেখা। এটি আমাদের শেখায় যে বৌদ্ধ ধর্মে ‘ব্যক্তি’ কোনো স্থায়ী সত্তা না হলেও আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথে ব্যক্তির গুণাবলী ও তার স্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থে আলোচিত ৫০ প্রকার পুদ্গল মূলত মানব চরিত্রের একটি বিশাল ক্যানভাস। এর মাধ্যমে একজন সাধক বুঝতে পারেন তার নিজের অবস্থান কোথায় এবং তার গন্তব্য কত দূরে। যদিও এটি সূত্র পিটকের কাছাকাছি মনে হয়, কিন্তু এর সুশৃঙ্খল শ্রেণিবিভাগ এবং বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি এটিকে অভিধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। এটি বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার এক মিলনস্থল, যা মানুষকে আসক্তি থেকে মুক্তির পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। এই গ্রন্থের ১০টি অধ্যায়ে বর্ণিত পুদ্গলদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, নির্বাণ লাভ কেবল একটি আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ক্রমবিকাশের ফল। আর সেই ক্রমবিকাশের প্রতিটি ধাপের নামই হলো ‘পুদ্গল প্রজ্ঞপ্তি’।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।
No comments