কথাবত্থু রচয়িতা, রচনাকাল ও মূল বিষয়বস্তুর বিস্তারিত আলোচনা
বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আধার হলো ‘অভিধর্ম পিটক’। এই পিটকের সাতটি গ্রন্থের মধ্যে পঞ্চম এবং অন্যতম বৈচিত্র্যময় গ্রন্থ হলো ‘কথাবত্থু’ (Kathavatthu)। এটি বৌদ্ধ শাস্ত্রের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন, কারণ ত্রিপিটকের অন্যান্য গ্রন্থ যেখানে বুদ্ধের বাণী বলে পরিচিত, সেখানে ‘কথাবত্থু’ একজন নির্দিষ্ট স্থবিরের রচনা হিসেবে স্বীকৃত। নিচে এর রচয়িতা, রচনাকাল এবং মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।
১. রচয়িতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
‘কথাবত্থু’ গ্রন্থের রচয়িতা হলেন সম্রাট অশোকের ধর্মগুরু এবং সমকালীন শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষু মোদগলিপুত্র তিষ্য স্থবির (Moggalliputta Tissa Thera)।
প্রেক্ষাপট:
মৌর্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক) বৌদ্ধ ধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। এর ফলে বৌদ্ধ সংঘে প্রচুর ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। এই পার্থিব লাভের আশায় বহু অ-বৌদ্ধ বা ভিন্ন মতাবলম্বী সন্ন্যাসী (তৈর্থিক) বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করে। তারা বৌদ্ধদের বিনয় ও শীল পালন না করে নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করতে শুরু করে। এর ফলে সংঘের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয় এবং প্রকৃত শীলবান ভিক্ষুরা তাদের সাথে উপোসথ বা ধর্মীয় কাজ করতে অস্বীকার করে অরণ্যে চলে যান।
এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং সংঘকে কলুষমুক্ত করতে সম্রাট অশোক পাটলিপুত্রে ‘তৃতীয় বৌদ্ধ মহাসংগীতি’ বা সম্মেলনের আহ্বান করেন। এই সংগীতির সভাপতি ছিলেন মোদগলিপুত্র তিষ্য স্থবির। তিনি ভিন্ন মতাবলম্বী ও ভণ্ড ভিক্ষুদের সংঘ থেকে বহিষ্কার করেন। এরপর বৌদ্ধ ধর্মের বিশুদ্ধ ‘থেরবাদ’ (Theravada) মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বিরুদ্ধবাদীদের যুক্তি খণ্ডন করার জন্য তিনি ‘কথাবত্থু’ নামক এই মহান গ্রন্থটি রচনা করেন।
২. রচনাকাল:
‘কথাবত্থু’ গ্রন্থের রচনাকাল নিয়ে ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও এটি মূলত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর রচনা বলে পরিগণিত হয়।
ঐতিহ্যগত মত: বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং ‘মহাবংশ’ ও ‘সমন্তপাসাদিকা’র মতো প্রাচীন আকর গ্রন্থ অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭ অব্দে সম্রাট অশোকের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংগীতির সমাপ্তির পর মোদগলিপুত্র তিষ্য এটি সংকলন করেন।
পণ্ডিতদের সংশয়: আধুনিক গবেষক যেমন ড. উইন্টারনিজ (Winternitz) এবং রীস ডেভিডস-এর মতে, সম্পূর্ণ গ্রন্থটি একই সময়ে রচিত হয়নি। তাদের মতে, অশোকের সময়ে মূল কাঠামোটি তৈরি হলেও পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এতে আরও নতুন নতুন অধ্যায় ও বিতর্ক যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব অধ্যায়ে ‘বৈতল্যক’ বা ‘হৈমবত’ সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে, সেগুলি অশোকের পরবর্তী যুগের বলে মনে করা হয়।
টীকাকার বুদ্ধঘোষের ভাষ্য: খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত বুদ্ধঘোষ ‘কথাবত্থু’র টীকা (অট্ঠকথা) রচনা করেন। তাঁর মতে, বুদ্ধ স্বয়ং এই গ্রন্থের একটি রূপরেখা বা ‘মাতিকা’ প্রদান করেছিলেন এবং তিষ্য স্থবির পরবর্তী সময়ে সেই কাঠামো অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা লিপিবদ্ধ করেন।
সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, গ্রন্থটির মূল অংশ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের, তবে এর বর্তমান রূপটি সম্ভবত কয়েকশ বছরের বিবর্তনের ফল।
৩. মূল বিষয়বস্তু ও আলোচনার পদ্ধতি
‘কথাবত্থু’ শব্দের অর্থ হলো ‘কথার বস্তু’ বা ‘তর্কের বিষয়’ (Points of Controversy)। এর মূল বিষয়বস্তু হলো থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের বিরোধী বিভিন্ন উপ-সম্প্রদায়ের (যেমন: মহাসাংঘিক, সর্বাস্তিবাদী, পুদ্গলবাদী ইত্যাদি) ভ্রান্ত ধারণা বা যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করা এবং থেরবাদ মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
(ক) তর্কমূলক কাঠামো:
গ্রন্থটি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে। এখানে দুটি পক্ষ থাকে—একটি ‘স্বকবাদী’ (যিনি থেরবাদের সমর্থক) এবং অন্যটি ‘পরবাদী’ (যিনি বিরোধী মত পোষণ করেন)। অনেকটা আধুনিক ডিবেট বা বিতর্কের ঢঙে এখানে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। আটটি ভিন্ন যৌক্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে (যাকে ‘অষ্টমুখ’ বলা হয়) বিপক্ষের যুক্তিকে খণ্ডন করা হয়।
(খ) আলোচ্য প্রধান বিতর্কসমূহ:
এই গ্রন্থে ২৩টি অধ্যায় (বগ্গ) রয়েছে এবং এতে প্রায় ২১৬টি বিতর্কিত বিষয় আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
১. পুগ্গল কথা: ব্যক্তির বা আত্মার অস্তিত্ব আছে কি না? থেরবাদীদের মতে স্থায়ী আত্মা নেই, কিন্তু পুদ্গলবাদীরা আত্মার অস্তিত্ব দাবি করত। তিষ্য স্থবির এখানে নৈরাত্মবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
২. অহর্ৎ কি বিচ্যুত হতে পারেন?: কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মতে একজন অর্হৎ (মুক্ত পুরুষ) আবারও পাপ করতে পারেন। কথাবত্থুতে এই যুক্তি খণ্ডন করে অর্হৎদের নিষ্কলঙ্কতা প্রমাণ করা হয়েছে।
৩. অতীত ও ভবিষ্যৎ কি বর্তমানের মতো সত্য?: সর্বাস্তিবাদীদের মতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিনটিই সত্য। ‘কথাবত্থু’ এই মতকে অস্বীকার করে কেবল বর্তমান মুহূর্তের কার্যকারিতাকে গুরুত্ব দেয়।
৪. বুদ্ধের অলৌকিকতা: বুদ্ধ কি মানুষ ছিলেন নাকি অতিপ্রাকৃত সত্তা? লোকোত্তরবাদীদের মতে বুদ্ধ মর্ত্যের মানুষ ছিলেন না। কিন্তু কথাবত্থু বুদ্ধের ঐতিহাসিক ও মানবিক রূপকে যুক্তিসহ তুলে ধরে।
(গ) ভাষাগত ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য:
ত্রিপিটকের অন্যান্য গ্রন্থ যেমন ধম্মসঙ্গণি বা বিভঙ্গ-এর ভাষা অত্যন্ত পারিভাষিক ও কাঠখোট্টা। কিন্তু ‘কথাবত্থু’র ভাষা অনেক বেশি প্রাণবন্ত এবং সাহিত্যিক গুণসম্পন্ন। এটি অনেকটা ‘মিলিন্দ পঞ্ঞ’ (King Milinda's Questions) গ্রন্থের সাথে তুলনীয়। লেখক মোদগলিপুত্র তিষ্য এখানে কেবল একজন ধর্মতত্ত্ববিদ হিসেবে নন, বরং একজন কুশলী তার্কিক ও সাহিত্যিক হিসেবেও নিজের পরিচয় দিয়েছেন।
৪. ঐতিহাসিক ও দার্শনিক গুরুত্ব:
বৌদ্ধ সাহিত্যের ইতিহাসে ‘কথাবত্থু’র গুরুত্ব অপরিসীম:
১. ইতিহাসের উৎস: এই গ্রন্থ থেকে মৌর্যোত্তর যুগের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপ-সম্প্রদায়ের উৎপত্তি, তাদের বিশ্বাস এবং মতভেদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। এটি প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল।
২. যুক্তিশাস্ত্রের বিকাশ: বৌদ্ধ দর্শনে ন্যায়ন্যায় বা লজিকের যে প্রাথমিক বিকাশ ঘটেছিল, ‘কথাবত্থু’ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এতে ব্যবহৃত যুক্তির ধারা পরবর্তীকালে নাগার্জুন বা ধর্মকীর্তির ন্যায় প্রাজ্ঞ দার্শনিকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
৩. থেরবাদের সুরক্ষা: যদি এই গ্রন্থটি রচিত না হতো, তবে বৌদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরে নানাবিধ আজগুবি ও অলৌকিক মতবাদ প্রবেশ করে মূল ধর্মাদর্শকে ধ্বংস করে দিত। এটি থেরবাদ ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার প্রাচীর হিসেবে কাজ করেছে।
৪. ব্যতিক্রমী রচনা: এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা বুদ্ধের পরিনির্বাণের কয়েকশ বছর পর কোনো মানুষের দ্বারা রচিত হওয়া সত্ত্বেও ‘পালি ত্রিপিটকে’ বা বুদ্ধের বাণীর মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, ‘কথাবত্থু’ কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি প্রাচীন ভারতের এক প্রজ্ঞাদীপ্ত বৌদ্ধ পণ্ডিদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ফসল। মোদগলিপুত্র তিষ্য স্থবির তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য এবং দার্শনিক প্রজ্ঞা দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে আবর্জনামুক্ত করেছিলেন। পাটলিপুত্রের সেই ঐতিহাসিক মহাসংগীতিতে রচিত এই গ্রন্থটি আজও আমাদের শেখায় কীভাবে যুক্তির মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাস ও ভ্রান্ত ধারণাকে জয় করা যায়।
বর্তমান যুগেও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনের আলোচনায় ‘কথাবত্থু’ একটি অপরিহার্য রেফারেন্স হিসেবে টিকে আছে। এটি যেমন থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তিভূমি, তেমনি এটি মানব চিন্তার ইতিহাসে যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের এক ধ্রুপদী নিদর্শন। মোদগলিপুত্র তিষ্যের এই সৃষ্টি বৌদ্ধ প্রজ্ঞার আলোকে আজও দেদীপ্যমান।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।
No comments