অভিধর্ম শব্দের অর্থ কি? অভিধর্মের রচনাকাল আলোচনা কর?
বৌদ্ধ শাস্ত্রের সুবিশাল কাননে ‘ত্রিপিটক’ হলো সেই আকর গ্রন্থ, যা সহস্রাব্দ ধরে মানবসভ্যতাকে প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা দান করেছে। এই ত্রিপিটকের তৃতীয় এবং সর্বাপেক্ষা জটিল ও দার্শনিক বিভাগটি হলো ‘অভিধর্ম পিটক’ (Abhidhamma Pitaka)। যদি ‘বিনয় পিটক’কে বলা হয় বৌদ্ধ ধর্মের শৃঙ্খলার ভিত্তি এবং ‘সূত্র পিটক’কে বলা হয় লোকব্যবহারিক উপদেশের ভাণ্ডার, তবে ‘অভিধর্ম পিটক’ হলো বুদ্ধের প্রজ্ঞার সেই অণুবীক্ষণ যন্ত্র, যা দিয়ে জগত ও জীবনের প্রতিটি অণু-পরমাণুকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। এটি কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ও সুসংহত মনস্তত্ত্ব এবং অধিবিদ্যা।
১. অভিধর্ম শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ বিশ্লেষণ:
‘অভিধর্ম’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘অভি’ উপসর্গের সঙ্গে ‘ধর্ম’ পদের সমন্বয়ে। পালি ও সংস্কৃত সাহিত্যে ‘অভি’ উপসর্গটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়— যেমন শ্রেষ্ঠত্ব, আধিক্য, বৈশিষ্ট্য বা অতিশয়তা। সুতরাং, ‘অভিধর্ম’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হলো— ‘অতিরিক্ত ধর্ম’, ‘বিশিষ্ট ধর্ম’ বা ‘উচ্চতর ধর্ম’।
আচার্য বুদ্ধঘোষের সংজ্ঞা:
বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত ও ভাষ্যকার আচার্য বুদ্ধঘোষ তাঁর ‘অট্ঠসালিনী’ গ্রন্থে অভিধর্মের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
“ধম্মাতিরেক ধম্ম বিসেসত্থেন অভিধম্মো”
অর্থাৎ, ধর্মতত্ত্বের অতিরিক্ত ও বিশিষ্ট ব্যাখ্যাই হলো অভিধর্ম।
সূত্র ও অভিধর্মের পার্থক্য:
সূত্র পিটকে বুদ্ধের বাণী বর্ণিত হয়েছে উপমা, রূপক, কাহিনী এবং লৌকিক ভাষার মাধ্যমে। সেখানে ‘আমি’, ‘তুমি’, ‘মানুষ’ বা ‘প্রাণী’র মতো লৌকিক সত্য (Sammuti Sacca) ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু অভিধর্ম পিটকে এই লৌকিক আবরণ ছিন্ন করে বিষয়বস্তুকে পরমার্থ সত্যের (Paramattha Sacca) মানদণ্ডে বিচার করা হয়েছে। অভিধর্মে ‘ব্যক্তি’র পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে স্কন্ধ, আয়তন ও ধাতু। সূত্র পিটক যেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, অভিধর্ম সেখানে সেই ওষুধের রাসায়নিক বিশ্লেষণ।
এ প্রসঙ্গে বৌদ্ধ শাস্ত্রের একটি সুন্দর উক্তি হলো—
“সুত্তন্তং পরস্সতি, অভিধম্মং অন্তোপদস্সতি।”
(অর্থাৎ: সূত্র বাহ্যিক রূপ দেখে, আর অভিধর্ম দেখে অন্তরের গভীর স্বরূপ।)
২. অভিধর্ম পিটকের রচনাকাল ও ঐতিহাসিক বিবর্তন:
অভিধর্ম পিটকের রচনাকাল নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্ককে আমরা দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে পারি: ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস এবং আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা।
(ক) ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মত:
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, স্বয়ং গৌতম বুদ্ধই অভিধর্মের প্রবর্তক। প্রচলিত আছে যে, বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর চতুর্থ সপ্তাহে ‘রতনঘরত্থানে’ বসে প্রথম অভিধর্মের গভীর তত্ত্ব চিন্তা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ত্ৰয়স্ত্রিংশ স্বর্গে (Tavatimsa Heaven) গিয়ে তাঁর স্বর্গীয় মাতা মায়াদেবী এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে তিন মাস ধরে একটানা অভিধর্ম দেশনা করেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি স্থবির সারিপুত্রকে সংক্ষেপে সেই তত্ত্ব শিক্ষা দেন এবং সারিপুত্রই তা বিন্যস্ত করে শিষ্যদের দান করেন।
(খ) ঐতিহাসিক ও আধুনিক পণ্ডিতদের মত:
আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, বুদ্ধের সমসাময়িক কালে অভিধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ পিটক হিসেবে ছিল না। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর থেকে শুরু করে সম্রাট অশোকের সময় পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০০ বছরে এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।
১. প্রাথমিক স্তর (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৪র্থ শতক): বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর প্রথম সংগীতিতে ‘ধম্ম’ ও ‘বিনয়’ আবৃত্তি করা হয়েছিল। তখন অভিধর্ম সম্ভবত সূত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে মজঝিম ও অঙ্গুত্তর নিকায়ের কিছু সূত্রে প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির যে বীজ পাওয়া যায়, তাকেই অভিধর্মের আদি উৎস বলা যেতে পারে।
২. মধ্যবর্তী স্তর ও অশোকের সময় (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক): সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির সময় অভিধর্মের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশিত হয়। এই সংগীতির সভাপতি মোদগলিপুত্র তিষ্য স্থবির ‘কথাবত্থু’ (Kathavatthu) নামক গ্রন্থটি রচনা করেন যা অভিধর্মের পঞ্চম গ্রন্থ। যেহেতু কথাবত্থু অশোকের সময়ের রচনা, তাই এর আগের চারটি গ্রন্থ (ধম্মসঙ্গণি, বিভঙ্গ ইত্যাদি) নিশ্চয়ই তার আগে রচিত হয়েছিল।
৩. চূড়ান্ত সংকলন (খ্রিস্টপূর্ব ২য়-১ম শতক): মিলিন্দ পঞ্ঞ (Milinda Panha) গ্রন্থে ‘ত্রিপিটক’ শব্দের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যেই সাতটি গ্রন্থসহ অভিধর্ম পিটক তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ভারহুত ও সাঁচীর শিলালিপিতে ‘ধম্মকথিক’ ও ‘পটিসম্ভিদা’র উল্লেখ থাকলেও ‘অভিধর্ম’ শব্দটির অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, পিটক হিসেবে এর স্বীকৃতি পেতে কিছুটা সময় লেগেছে।
৩. অভিধর্মের মূল প্রতিপাদ্য: চারটি পরমার্থ সত্য
বৌদ্ধাচার্য বুদ্ধদত্ত এবং পরবর্তী টীকাকারদের মতে, অভিধর্মের সমগ্র আলোচনা চারটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: **চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ।**
১. চিত্ত (Citta):
চিত্ত হলো সেই শক্তি যা কোনো বিষয়কে বিজানন বা অনুভব করে। “বিজানাতীতি চিত্তং”— যা জানে বা চিন্তা করে তাই চিত্ত। অভিধর্মে ৮৯ প্রকার (মতান্তরে ১২১ প্রকার) চিত্তের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২. চৈতসিক (Cetasika):
চিত্তের সাথে যা উৎপন্ন হয় এবং চিত্তের গুণাবলী নির্ধারণ করে, তাই চৈতসিক। এটি চিত্তের অলঙ্কার বা উপকরণ। ৫২ প্রকার চৈতসিক মনের সাথে যুক্ত হয়ে বিচিত্র মানসিক অবস্থার সৃষ্টি করে। চিত্ত ও চৈতসিকের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য— যেমন সাগরের জল ও তার লবণাক্ততা।
৩. রূপ (Rupa):
জড় জগত বা শরীরের গঠনতন্ত্র হলো রূপ। অভিধর্মে ২৮ প্রকার রূপের কথা বলা হয়েছে। রূপ অনিত্য এবং পরিবর্তনশীল। এর কোনো স্থায়ী সত্তা নেই।
৪. নির্বাণ (Nibbana):
নির্বাণ হলো একমাত্র ‘অসংস্কৃত’ (Unconditioned) ধর্ম। যার জন্ম নেই, ক্ষয় নেই, যা সকল দুঃখের অন্ত। নির্বাণ কেবল অভাবাত্মক নয়, এটি পরমার্থিকভাবে বিদ্যমান শান্তি।
“নিব্বাণং পরমং সু্খং” বুদ্ধের এই অমোঘ বাণীই অভিধর্মের শেষ লক্ষ্য।
৪. সত্তপকরণ: অভিধর্মের সাতটি রত্ন:
অভিধর্ম পিটক সাতটি প্রধান গ্রন্থের সমষ্টি, যাকে একত্রে ‘সত্তপকরণ’ বা ‘সপ্তপ্রকরণ’ বলা হয়:
১. ধম্মসঙ্গণি: চিত্ত ও চৈতসিকের শ্রেণীবিন্যাস।
২. বিভঙ্গ: ধর্মসমূহের বিশ্লেষণাত্মক ব্যাখ্যা।
৩. ধাতু কথা: স্কন্ধ, আয়তন ও ধাতুর পারস্পরিক সম্পর্ক।
৪. পুগ্গল পঞ্ঞত্তি: বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তির পরিচয়।
৫. কথাবত্থু: পরমত খণ্ডন ও থেরবাদ প্রতিষ্ঠা।
৬. যমক: দ্বান্দ্বিক বা জোড়া জোড়া প্রশ্নের মাধ্যমে সত্যের বিচার।
৭. পট্ঠান: ২৪ প্রকার ‘প্রত্যয়’ বা কার্যকারণ তত্ত্বের মহাজাগতিক বিশ্লেষণ।
৫. অভিধর্মের শৈলী ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য:
অভিধর্ম পিটকের ভাষা অত্যন্ত গম্ভীর, বৈজ্ঞানিক এবং সংজ্ঞানির্ভর। এতে সূত্র পিটকের মতো লালিত্যময় কাহিনী নেই, বরং আছে কঠোর যুক্তি ও বিশ্লেষণ। এটি প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিতে রচিত। মজঝিম নিকায়ের ‘বিভব সুত্ত’ বা ‘ধম্মবিচয়’ এর যে ধারা, তারই পূর্ণতা ঘটেছে এখানে।
বৌদ্ধ মনস্তত্ত্বে অভিধর্মের স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। সাগরের নীল জল যেমন আকাশে ছায়া ফেলে, তেমনি অভিধর্মের প্রতিটি শব্দ সত্যের গভীর অতলকে স্পর্শ করে। মানুষের ‘আমি’ এবং ‘আমার’ নামক যে চিরন্তন ভ্রান্তি, তাকে চূর্ণ করাই অভিধর্মের প্রধান সাহিত্যিক ও দার্শনিক উদ্দেশ্য।
পরিশেষে বলা যায় যে, অভিধর্ম পিটক কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানুষের আত্মানুসন্ধানের এক নিখুঁত মানচিত্র। এর রচনাকাল নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও এর উপযোগিতা চিরকালীন। অভিধর্ম আমাদের শেখায় যে, জগত কোনো স্থির বস্তু নয়, বরং তা কতগুলো শক্তির নিরন্তর প্রবাহ। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার ক্রোধ, লোভ বা মোহের কোনো স্থায়ী ‘কর্তা’ নেই, বরং তা কতগুলো চিত্ত ও চৈতসিকের অস্থায়ী খেলা— তখনই তার হৃদয়ে নির্বাণের প্রদীপ জ্বলে ওঠে। বুদ্ধের ভাষায়—“সব্বে ধম্মা অনাত্তা”* (সকল ধর্মই অনাত্ম বা আত্মাহীন)।
অভিধর্ম সেই অনাত্ববাদেরই এক সুসংহত বিজ্ঞান। এটি যেমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ, তেমনি আধ্যাত্মিক সাধনার সোপান। জীবনের জটিলতা থেকে মুক্তির জন্য প্রজ্ঞার যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র বুদ্ধ দান করেছিলেন, অভিধর্ম পিটকই হলো সেই অমূল্য রত্ন। এর পঠন ও মনন মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে সত্যের জ্যোতির্ময় লোকে পৌঁছে দেয়।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।

No comments