রাজর্ষি অশোকের শ্রেষ্ঠ ত্যাগ: মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার প্রব্রজ্যা ও সদ্ধর্মের দিগ্বিজয়
রাজর্ষি অশোকের শ্রেষ্ঠ ত্যাগ: মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার প্রব্রজ্যা ও সদ্ধর্মের দিগ্বিজয়
ইতিহাসের পাতায় সম্রাট অশোকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য বা রণকৌশলের জন্য নয়, বরং তাঁর আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে তাঁর অতুলনীয় অবদানের জন্য। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্রাটকে চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিণত করেছিল। তিনি ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে বুদ্ধের বাণী পৌঁছে দিতে ৮৪ হাজার বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন, বুদ্ধের পবিত্র অস্থিধাতু উদ্ধার করে তা জনগণের সৎকার ও পূজার জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পরেও সম্রাটের হৃদয়ে একটি সূক্ষ্ম অতৃপ্তি রয়ে গিয়েছিল। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, বুদ্ধের শাসনে বা ধর্মে তাঁর প্রকৃত অবস্থান কোথায়? এই জিজ্ঞাসাই জন্ম দিয়েছিল এক মহান ত্যাগের কাহিনীকে, যা তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সঙ্ঘমিত্রার প্রব্রজ্যার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়।
সম্রাটের জিজ্ঞাসা ও মহাস্থবিরের উত্তর:
পবিত্র বুদ্ধাস্থি নিধানের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সম্রাট অশোকের মনে এক গভীর প্রশ্নের উদয় হলো। তিনি তৎকালীন মহাস্থবিরদের বন্দনা করে অত্যন্ত বিনম্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, "ভন্তে, আমি কি এখন সম্যক সম্বুদ্ধের শাসনের ‘দায়াদ’ বা উত্তরাধিকারী হতে পেরেছি?"
সম্রাট ভেবেছিলেন, আশি হাজার বিহার নির্মাণ এবং অঢেল ধনরত্ন ব্যয়ে বুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা করার পর তিনি অবশ্যই এই শাসনের প্রধান অংশীদার হয়েছেন। কিন্তু উপস্থিত সংঘস্থবির বা মহাস্থবির মোগগলিপুত্ত তিষ্য (মতান্তরে সংঘের প্রধানগণ) যে উত্তর দিলেন, তা সম্রাটের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেল। মহাস্থবির ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
> *"মহারাজ! আপনার ন্যায় চর্তুপ্রত্যয় (অন্ন, বস্ত্র, শয়ন ও ভেষজ) দায়ক বুদ্ধের জীবদ্দশায়ও কেউ ছিলেন না। ত্যাগের গুণে আপনি নিঃসন্দেহে প্রধান, কিন্তু মহারাজ, আপনি এখনো বুদ্ধ শাসনের প্রকৃত দায়াদ নন। আপনি এখনো শাসনের বহির্ভূত একজন মহান দাতা মাত্র।"*
প্রকৃত ‘দায়াদ’ হওয়ার শর্ত:
মহাস্থবিরের এই কথায় সম্রাট অশোক যারপরনাই বিস্মিত ও ব্যথিত হলেন। তিনি ব্যাকুল হয়ে বললেন, "ভন্তে! আমি ছিয়ানব্বই কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে ৮৪ হাজার বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করেছি। আমার সমস্ত সম্পদ ও শ্রম বুদ্ধের চরণে নিবেদন করেছি। আমি যদি শাসনের দায়াদ হতে না পারি, তবে এই পৃথিবীতে আর কে এই পদের যোগ্য হবে?"
তখন মহাস্থবির বৌদ্ধ ধর্মের সেই গূঢ় সত্যটি সম্রাটের সামনে উন্মোচন করলেন। তিনি বললেন, "মহারাজ, কেবল ধন-সম্পদ বা অট্টালিকা দান করলেই শাসনের উত্তরাধিকারী হওয়া যায় না। সেই ব্যক্তিই প্রকৃত ‘শাসন দায়াদ’ বা ধর্মের উত্তরাধিকারী, যিনি তাঁর নিজের রক্তমাংসের প্রিয় সন্তানকে—পুত্র কিংবা কন্যাকে—বুদ্ধের শাসনে উৎসর্গ করেন এবং তাঁদের প্রব্রজ্যা বা উপসম্পদা গ্রহণের অনুমতি দেন। কেবল সন্তানের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই একজন পিতা বুদ্ধের শাসনের অখণ্ড অংশে পরিণত হন।"
মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার সংকল্প:
মহাস্থবিরের এই বাণী সম্রাট অশোকের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। তিনি উপলব্ধি করলেন, পার্থিব ঐশ্বর্য ত্যাগের চেয়ে প্রিয়জন ত্যাগের মহিমা অনেক বেশি। ঠিক সেই মুহূর্তে সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ২০ বছর বয়সী কুমার মহেন্দ্র এবং ১৮ বছর বয়সী রাজকন্যা সঙ্ঘমিত্রা পিতার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তাঁরা উভয়েই ছিলেন ধর্মের প্রতি অনুরাগী এবং প্রজ্ঞাবান।
কুমার মহেন্দ্র ও রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রা করজোড়ে পিতার সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে বললেন—
"পিতঃ! আমাদের অনুমতি প্রদান করুন। আমরা শাসনের দায়াদ হওয়ার জন্য এবং জগতের কল্যাণে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা গ্রহণ করতে চাই। আপনার দানকে সার্থক করতে এবং রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে নির্বাণের পথে যাত্রা করতে আমরা প্রস্তুত।"
সম্রাট অশোক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। একদিকে তাঁর পিতৃহৃদয়ের গভীর মমতা, অন্যদিকে বুদ্ধের ধর্মের প্রতি অটল শ্রদ্ধা। অবশেষে ধর্মেরই জয় হলো। তিনি সজল নয়নে তাঁর দুই সন্তানকে পরম স্নেহে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁদেরকে বুদ্ধের চরণে উৎসর্গ করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদার মহাসমারোহ:
সম্রাট অশোকের সম্মতিতে অত্যন্ত মহাসমারোহে মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার প্রব্রজ্যা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। কুমার মহেন্দ্র মহাস্থবির মোগগলিপুত্ত তিষ্যের নিকট প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন এবং রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রা স্থবিরা ধর্মপালার নিকট দীক্ষিত হলেন। রাজকীয় পোশাক ও অলংকার ত্যাগ করে তাঁরা সাধারণ চীবর ধারণ করলেন।
বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, মহেন্দ্র অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সাধনা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে ‘অরহত্ব’ ফল লাভ করেন। সঙ্ঘমিত্রাও তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনায় চরম শিখরে আরোহণ করেন। এই অলৌকিক ত্যাগের পর মহাস্থবিরগণ তৃপ্ত চিত্তে ঘোষণা করলেন—
"মহারাজ! আজ আপনি ধন্য। আজ থেকে আপনি সম্যক সম্বুদ্ধের শাসনের প্রকৃত দায়াদ বা উত্তরাধিকারী হলেন।"
লঙ্কা দ্বীপে ধর্ম বিজয় ও মহেন্দ্র:
প্রব্রজ্যা লাভের পর মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাধনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় মহেন্দ্র লঙ্কা দ্বীপে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন লঙ্কার অধিপতি ছিলেন সম্রাট অশোকের পরম বন্ধু দেবানামপ্রিয় তিষ্য।
মহেন্দ্র তাঁর জটাসমূহ নিয়ে আকাশপথে (অলৌকিক ঋদ্ধিবলে) লঙ্কা দ্বীপের মিস্সক পর্বতে (বর্তমান মিহিনতালে) অবতীর্ণ হন। সেখানে রাজা তিষ্যের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। মহেন্দ্রের অমৃতবাণী এবং অলৌকিক প্রজ্ঞায় বিমুগ্ধ হয়ে রাজা দেবানামপ্রিয় তিষ্য সপরিবারে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। লঙ্কা দ্বীপে বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তি স্থাপিত হলো। রাজা তিষ্য লঙ্কা দ্বীপে অসংখ্য স্তূপ ও বিহার নির্মাণ করেন, যা আজও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
সঙ্ঘমিত্রা ও মহাবোধি বৃক্ষের দক্ষিণ শাখা:
লঙ্কা দ্বীপে যখন সদ্ধর্মের প্রচার শুরু হলো, তখন রাজপুরীর মহিলারাও বুদ্ধের শাসনে দীক্ষিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু বৌদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের প্রব্রজ্যা প্রদানের জন্য একজন অভিজ্ঞ ভিক্ষুণীর প্রয়োজন ছিল। তাই মহেন্দ্রর অনুরোধে এবং রাজা তিষ্যের আমন্ত্রণে সম্রাট অশোক তাঁর কন্যা সঙ্ঘমিত্রাকে লঙ্কায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
সঙ্ঘমিত্রা কেবল একা যাননি, তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অমূল্য সম্পদ—গয়ার মূল মহাবোধি বৃক্ষের (যে বৃক্ষের তলে বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন) একটি দক্ষিণ শাখা। এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। সমুদ্রপথে অলৌকিক নানা বাধা অতিক্রম করে তিনি লঙ্কার জম্বুকোলা পত্তনে এসে পৌঁছান। রাজা তিষ্য নিজে গভীর সমুদ্রে গিয়ে সেই বোধি শাখা গ্রহণ করেন।
অনুরাধাপুরের মহামেঘবনে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সেই মহাবোধি শাখা রোপণ করা হয়। বৌদ্ধ সাহিত্যে বর্ণিত আছে—
*"সঙ্ঘমিত্রা যে মূল মহাবোধি তরুর দক্ষিণ শাখা লঙ্কাদ্বীপস্থ অনুরাধাপুরে নিয়ে রোপণ করেছিলেন, সেটি আজও বিদ্যমান রয়েছে।"*
(সূত্র: মহাপরিনির্বাণ সুত্তং, পৃষ্ঠা ১৭৩)
এই বোধি বৃক্ষটি বর্তমানে বিশ্বের প্রাচীনতম ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত বৃক্ষ হিসেবে স্বীকৃত, যা গত ২৩০০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পূজিত হয়ে আসছে। সঙ্ঘমিত্রা লঙ্কা দ্বীপে ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নারী সমাজের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটান।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব:
সম্রাট অশোকের এই ত্যাগ বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ধর্মের প্রতি অনুরাগ কেবল মন্দির বা স্তূপ নির্মাণে নয়, বরং আত্মত্যাগের মধ্যেই নিহিত। মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার মাধ্যমে লঙ্কা দ্বীপে যে ধর্মের জ্যোতি জ্বলে উঠেছিল, তা পরবর্তীকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরে রাজা দেবানামপ্রিয় তিষ্য কর্তৃক নির্মিত 'থুপারাম' স্তূপ এবং অন্যান্য স্থাপত্যসমূহ আজও অশোকের সেই ধর্ম বিজয়ের স্মৃতি বহন করছে। মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার এই মহান আত্মদান ছাড়া হয়তো বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বধর্মে পরিণত হতে পারত না।
উপসংহার: সম্রাট অশোকের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী ধর্মপ্রাণ পিতা। নিজের সন্তানকে ধর্মের সেবায় উৎসর্গ করে তিনি যে আদর্শ স্থাপন করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা কেবল দুটি মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল একটি সভ্যতার উত্থান এবং একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা।
মহাপ্রজ্ঞাবান মহেন্দ্র লঙ্কার আধ্যাত্মিক পিতা হিসেবে এবং করুণাময়ী সঙ্ঘমিত্রা নারী মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে বৌদ্ধ বিশ্বে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের পদচিহ্ন আজও অনুরাধাপুরের পবিত্র ভূমিতে এবং মহাবোধি বৃক্ষের শীতল ছায়ায় অনুভূত হয়। সম্রাট অশোকের সেই ‘শাসন দায়াদ’ হওয়ার বাসনা পূর্ণ হয়েছিল তাঁর সন্তানদের ত্যাগের মহিমায়, যার ফলশ্রুতিতে আজও কোটি কোটি মানুষ বুদ্ধের সদ্ধর্মের সুশীতল আশ্রয়ে শান্তি খুঁজে পায়। এই কাহিনী শিক্ষা দেয় যে, বৃহত্তম ত্যাগের মাধ্যমেই বৃহত্তম প্রাপ্তি সম্ভব—আর তা হলো নির্বাণ ও ধর্মের শাশ্বত উত্তরাধিকার।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।

No comments