চাকমা বৌদ্ধ জাতির পরিচয়, চাকমা শব্দের উৎপত্তি, বংশ নির্ণয়, শারীরিক গঠন, শ্রেণি বিভাগ
বর্তমান বিশ্বসভ্যতার ভূমিকায় চাকমা বৌদ্ধরা এক শ্রেষ্ঠতম আসন অধিকার করে আছে। তাঁরা বিদ্যা-বুদ্ধি, শিল্প-সাহিত্যে বিশ্বের অন্যান্য সভ্য জাতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বর্তমানের এঁদের বসবাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মিয়ানমারে (বার্মা) আরাকান, ভারতে ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও অরুণাচল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে মিয়ানমারের (বার্মা) আরাকানেও দৈনাক নামে চাকমাদের একটি শাখা রয়েছে বলে জানা যায়। এই চাকমা জাতির তৃতীয় অংশটি তঞ্চঙ্গ্যা নামে অভিহিত। অনুসন্ধিৎসু মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে চাকমাদের আদিবাস স্থান কোথায়? চাকমারা ভারতে চম্পকনগর, ত্রিপুরা, ব্রহ্মদেশ, আরাকান, আলীকদম, রাঙ্গুনীয়া, চট্টগ্রাম ইত্যাদি স্থানের ঐতিহাসিক কাহিনীর সহিত জড়িত ও সংশ্লিষ্ট।
চাকমা ঐতিহাসিক বিবরণীতে জানা যায়, কোশল রাজ প্রসেনজিতের পুত্র বিড়ুঢ়ভের আক্রমণে শাক্যবংশ কপিলাবস্তু হতে বিতাড়িত হন। কপিলাবস্তু আক্রমণের অল্প সময় পরই বিদূঢ়ভ এক ভয়াবহ বন্যায় প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে বুদ্ধের চুয়াল্লিশতম বর্ষাবাসের সময় অজাতশত্রু কোশল আক্রমণ করে রাজ্যটি অধিকার করেন। যে শাক্যরা (সম্ভবত মহানামের অনুসারী ও অন্যান্য জীবিত ব্যক্তিরা) কপিলাবস্তুতে বসবাস অব্যাহত রেখেছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই ঘটনায় যে, বুদ্ধ কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ লাভের এক বছর পরে কপিলাবস্তুর শাক্যরা সৈন্যবাহিনীসহ সেখানে উপস্থিত হয়ে বুদ্ধের ধাতুর (পবিত্র অস্থি-অবশেষ) অংশ দাবি করেন। পরে তাঁরা সেই ধাতুর ওপর একটি স্তুপ নির্মাণ করেন (Buddhist Pilgrimage- বৌদ্ধ তীর্থযাত্রা, লেখক: Chan Khoon San - চ্যান খুন সান, ২০০৯ইং, ৮৭ পৃষ্ঠা)।ক্রমে ক্রমে দেশ-দেশান্তরে বসতি স্থাপন করে ঘুরতে ঘুরতে চম্পক নগরে বসবাস করতে থাকেন। এই চম্পক নগর বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে ভাগলপুরে অবস্থিত। কালক্রমে এই শাক্যবংশ শক্তিশালী হয়ে উঠে। কথিত আছে, চম্পক নগরের রাজা সম্বুদ্ধের বিজয় গিরি ও উদয় গিরি নামে দুই পুত্র ছিল। তাঁর এক সেনাপতি রাধামনকে নিয়ে চট্টগ্রাম, আরাকান অঞ্চল, মুরুং ইত্যাদি এলাকায় অভিযান চালান। এ অভিযানে কুমার বিজয় গিরি জয়লাভ করে চতুর্থ কি পঞ্চম শতাব্দীতে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ দিকে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে ছোট ভাই উদয় গিরি রাজসিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি এই খবর জ্ঞাত হয়ে চম্পক নগরের রাজধানীতে ফিরে না গিয়ে চট্টগ্রামে বিজিত রাজ্য শাসন করেন।
এই ‘‘চাগমা’’ জাতিগোষ্ঠী শাব্দিক বা উচ্চারণগত দিক থেকে যাই হোক না কেন এঁরাই যে বর্তমানে ‘‘চাকমা’’ নামে পরিচিত জনগোষ্ঠী তাতে কোন সন্দেহ নেই। চাকমারা মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং ‘‘বিজু’’ তাঁদের প্রধান সামাজিক উৎসব। চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘‘জুম নৃত্য’’ দেশে-বিদেশে দারুণভাবে প্রশংসিত। সমতলীয়দের তুলনায় চাকমাদের শিক্ষিতের হার অধিক। তবে চাকমা জাতির রমণীরা অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী। চাকমাদের মধ্যে প্রচলিত কথ্য ভাষার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে স্পষ্টতঃ প্রমাণিত হয় যে, তা বাংলা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষারই অপভ্রংশ। চাকমারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অপভ্রংশের মতো উচ্চারণ রীতি ব্যবহার করলেও চাকমা ভাষার বর্ণমালা বর্মী আদলে তৈরি।
চাকমা শব্দের উৎপত্তি:
কোন কোন
পণ্ডিতদের মতে “চাকম্যাং”
শব্দটি হতে ‘চাকমা’
শব্দের উৎপত্তি। আরাকানীরা শাক্যবংশকে “চাকম্যাং”
বলতেন। এ চাকমা শব্দটির
অর্থ আমরা পাই “চাক”
অর্থ শাক্য আর “ম্যাং” শব্দের অর্থ
রাজবংশ। সুতরাং এর অর্থ শাক্য
রাজবংশ। চাকমারাও নিজেদের শাক্যবংশ বলে দাবী করেন।
রাজা ভূবন মোহন রায় প্রাচীন রাজবংশের ইতিহাসে দেখা যায়, মগ ভাষায় “চাক-চেক” অর্থ শাক্য এবং যাঁরা শাক্যরাজবংশীয় তাঁদেরকে বলা হত চাকম্যাং অর্থাৎ শাক্য রাজবংশীয়। ব্রহ্ম ভাষায় ম্যাং শব্দের অর্থ রাজা, এই চাকম্যাং বা চাকমাং হতে রূপান্তরে এখন চাকমা হয়েছে (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত- বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ ইংরেজী, পৃঃ- ২৫)।
মতান্তরে কর্ণ তালুকদারের বামুনী লেখা (প্রাচীন বাংলা) হতে প্রাপ্ত “রাজবংশাবলী” পুঁথির তথ্যে জানা যায়, রাজা বিজয়গিরির আরাকান (অক্রাদেশ) অভিযানের পর, ব্রহ্মদেশের চাকমা রাজারা রাজ্যাভিষেক ব্যবস্থা শ্বেত হস্তীর দ্বারা সম্পন্ন করতেন এবং বিভিন্ন কাজে হস্তীর ব্যবহারের প্রাচুর্য্য, ব্রহ্মদেশে চাকমাদের ‘চাংম্যাং’ নামে আখ্যায়িত করতেন। ব্রহ্মদেশীয় ভাষায় চাং অর্থে হাতী আর ম্যাং অর্থে রাজা, এই শব্দদ্বয় হতেই ‘চাকমা’ নামের আদি উৎসের পরিচয় ভিত্তি বলে এতে উল্লেখ পাওয়া যায় (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত- বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ ইংরেজী, ২৬ পৃঃ)।
ক্যাপ্টেন টি.এইচ.লুইন বলেছেন, চাকমা শব্দটি কখনও কখনও সাকমা বা সাক অথবা বর্মী ভাষায় থেক্ নামে উচ্চারণ করা হয়। চাকমা জাতির একটি ক্ষুদ্রাংশ মিয়ানমারে (বার্মায়) “দৈংনাক’’ নামে পরিচিত। এই চাকমা জাতির তৃতীয় অংশটি তঞ্চঙ্গ্যা নামে অভিহিত। (ক্যাপ্টেন টি.এইচ.লুইন চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীবৃন্দ, ১৯৯৬ইংরেজী, পৃষ্ঠা- ৭৫)।
অতীতে চাকমারা ব্রহ্মদেশে এসে চাক-চেক-বা চ্যাম্যাং নামে অভিহিত হন। স্থান, কাল ও অবস্থাভেদে সবই পরিবর্তন হতে বাধ্য। এতে অনেকে অনুমান করেন এ ক্ষেত্রেও চম্পক নগর হতে আগত লোকেদের ব্রহ্মদেশে এসে চাক-চেক-বা চাকমা নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভাষা পার্থক্য হতে উচ্চারণের ভিন্নতা প্রকাশ পায়। তদ্রুপ চম্পক-চাম্পা-চাকমা হয়েছে। যেমন অনেক সাধারণ বাঙ্গালি চাকমাদের “চাম্মুয়া” বলে থাকে (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত- বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ ইংরেজী, ১৫ পৃঃ)।।
এতে দেখা যায় চাক-চেক-চাং ব্রহ্মদেশীয় এক রূপান্তরিত শব্দ। চাকমা মূলতঃ শাক্যবংশ সম্ভূত এবং চাকমা নামটি শাক্য বংশের নামেরই নামান্তর।
চাকমা বৌদ্ধদের বংশ নির্ণয়:
চাকমারা
দাবী করে থাকেন তাঁরা শাক্যবংশ জাত। চাকমা জাতির ইতিহাসেও অনুরুপ দৃষ্ট হয়। শাক্য জাতিকে মগেরা বলত “শাক”
বা “চাক”। যাঁরা শাক্য
রাজবংশীয় তাঁদেরকে বলত “শাকম্যাং”। “ম্যাং” শব্দের অর্থ
রাজা । অর্থাৎÑ
শাক্য রাজবংশীয়। কিন্তু বাঙ্গালি গ্রন্থাচার্য ব্রাহ্মণগণ চম্পক নগর বাসী বলে চাম্পা বা পরিশেষে “চাকমা” নামে অভিহিত
হয়ে ছিলেন (শ্রী শ্রী রাজনামা, শ্রী মাধব চন্দ্র রায়, পৃঃ ২১)। এই
তথ্য হতে সহজে এই সিদ্ধান্তে উপনীত
হওয়া যায় যে চাকমারা শাক্যবংশ
জাত।
চাকমা রাজগুরু শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাথেরো মহোদয় বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্য মিয়ানমারে (বার্মায়) প্রায় ১২ বছর পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন। তিনি বলেন ম্যাউমা হাই স্কুলের শিক্ষক উভা-তাং বি. এ মহোদয় মেট্রিক পাঠ্যের জন্য যে ব্রহ্মদেশের ইতিহাস রচনা করেন, তাতে চাকমারা যে শাক্যবংশ সম্ভূত তার প্রমাণ রয়েছে। তিনি মিয়ানমারে (বার্মায়) অবস্থানকালীন সময়ে নেপালের শ্রীমৎ জগদীশ্বর ভিক্ষু ও শ্রীমৎ কস্যপ ভিক্ষুর সাক্ষাৎ পান। তাঁরা নেপালে শাক্য বংশের অনুরুপ তথ্যের সন্ধান রয়েছে বলে তাঁকে জানান (চাকমা জাতি ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন চাকমা- ১৯৬৯ইং ১৩১৬ বাংলা, পৃ:২৭)।
গ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তাঁর আদিবাসীবৃন্দ গ্রন্থে ক্যাপ্টেন টি, এইচ, লুইন (বঙ্গানুবাদ, হিরহিত চাকমা- ১৯৯৬ইং, পৃ: ৭৫-৭৬) কোন এক জনশ্রুতি নিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মোগলবংশ জাত। কিন্তু জনশ্রুতি কখনও প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। যদি বা এর সমর্থনে তিনি জামুল খাঁ, শেরমুস্ত খাঁ, শেরদৌলত খাঁ, টব্বর খাঁ, ধরম বক্স খাঁ, চাকমা রাজার নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সতীশ চন্দ্র ঘোষ এর প্রতিবাদ করে বলেছেন যে, চট্টগ্রামে মোগল অধিকার স্থায়ীরুপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র আড়াইশ বছরের কম। উক্ত জনশ্রুতি সত্য হলে চাকমা জাতির উৎপত্তিকাল তিনশত বছরের অধিক হতে পারে না, সুতরাং এটা একেবারেই অসম্ভব। চট্টগ্রামে মুসলমানদের প্রাবাল্য সময়ে এই করদরাজণ্যবর্গ এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার পুরুষদের ‘খাঁ’ উপাধি আর মেয়েদের ‘বিবি’ উপাধি বা সম্মান সূচক খেতাব মোগল রাজাদের নিকট হতে গ্রহণ করতেন। এমনকি মোগলদের সাথে যুদ্ধে অধিকার করা কামানের নামও খালু খাঁ ও ফতে খাঁ গৌরব বাচক ‘খাঁ’ আখ্যা লাভ করে (চাকমা জাতি ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন দেওয়ান-১৯৬৯ইং, পৃ: ২৮)। অনুরুপভাবে হিন্দুদের নানা রীতিনীতি ও নামের ক্ষেত্রে প্রভাব প্রবলভাবে দেখা যায়। রাজা নলিনাক্ষ রায়, রাজা ভূবন মোহন রায়, রাজা ত্রিদিপ রায়, রাজা দেবাশীয় রায় প্রমূখ রাজাণ্যবর্গ। এছাড়া হিন্দুদের লক্ষী পূজা চাকমাদের মধ্যে একসময় প্রবলভাবে প্রচলন ছিল। বৌদ্ধধর্ম পুনরুত্থানে ইদানিং এই প্রচলন বিলুপ্ত হয়েছে বলা যায়। তাই বলে চাকমা রাজণ্যবর্গ হিন্দু ছিলেন তা কখনও হতে পারে না। তাই ক্যাপ্টেন টি, এইচ,লুইন এর অভিমত কখনও গ্রহণ যোগ্য হতে পারে না। এছাড়াও চাকমা সমাজে মোগল আমল থেকে দেওয়ান, তালুকদার ও খীসা এই উপাধিগুলো ব্যবহার হয়ে আসলেও পরে ব্রিটিশ শাসনামলে মূলতঃ ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও রাজস্ব আদায় করার সুবিধার্থে উক্ত উপাধিধারী লোকদেরকে আরো আনুষ্ঠানিক ও সুসংগঠিতভাবে কাজে লাগিয়েছেন নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। এখন ক্যাপ্টেন টি.এইচ. লুইনের অভিমত অনুসারে মোগল আমলের খাঁ উপাধি ধারন করার কারণে চাকমারা যদি মোগল বংশজাত হয়ে থাকেন তাহলে ব্রিটিশ শাসনামলের দেওয়ান, তালুকদার ও খীসা উপাধিধারী চাকমারাও তো ইংরেজ বংশজাত কেউ দাবী করতে পারেন। এরকম দাবী করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় চাকমারা শাক্যবংশ জাত এবং গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশা থেকেই তাঁরা বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন। ভারতবর্ষে যখন বৌদ্ধধর্মের উত্থান-পতন হয় তখন বিভিন্ন রাজণ্যবর্গের শাসনামলে কিছু অবৌদ্ধ সংস্কৃতি চাকমা বৌদ্ধ সমাজকে একটা সময়ের জন্য গ্রাস করেছিল ঠিকই কিন্তু বৌদ্ধধর্ম পুনরুত্থানে চাকমারা বর্তমানে অনেকটা অন্ধকুসংস্কার মুক্ত বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। কাজেই চাকমাদেরকে ক্যাপ্টেন টি.এইচ. লুইন যেই মোগল বংশজাত বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন তা ছিল কল্পনাপ্রসূত।
চাকমা
জাতি গ্রন্থে সতীশ চন্দ্র ঘোষ চাকমা বৌদ্ধদের শরীরের গঠন সম্পর্কে বলেছেন- এঁদের মুখমন্ডল গোলাকার নাসিকা নত ও চেপ্টা,
গন্ডদেশের অস্থি উন্নত, বক্ষ প্রশস্ত. বাহুযুগল মাংসল, জংগাদেশ অতিশয় স্থূল ও সুদৃৃঢ় অক্ষি
গোলকের কপিলাভাস এবং বক্র দৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ে শরীর বেশ হৃষ্ট-পুষ্ট, বলিষ্ঠ
ও সুদৃঢ় বটে কিন্তু সুগঠিত নয়। শারীরিক উপাদান সমুহের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য নেই, বর্ণ গৌর সত্য কিন্তু লাবণ্য বর্জিত। বেশ-ভূষণেও এরা নিতান্তই অসৌভাগ্য। পুরুষেরা বিরলগুল্ফ শ্মশ্রুহীন বললেও চলে। রমণী সমাজেও আগুলফ বিলম্বিত কেশাদাম স্বপ্নের অগোচরে। (চাকমা জাতি, জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত- সতীশ
চন্দ্র ঘোষ, ১৯০৯ ইংরেজী, পৃষ্ঠা-২)।
বঙ্গীয় জাতি ও বংশ গ্রন্থে স্যার রিজলী মহোদয় নানা প্রমাণ-প্রয়োগ সহকারে বলেছিলেন যে, তাদের শারীরিক গঠন ও বর্ণগত বৈসাদৃশ্যে চাকমাদের শতকরা ৮৪.৫৬ ভাগ অংশ মঙ্গোলিয়ান চেহারা বলে দাবী করেছেন। কিন্তু পণ্ডিত হারবাচো মহোদয় স্যার রিসলী উক্ত মন্তব্য সম্পর্কে উক্তি করেছেন যে, সঠিক পরিচয় নির্ণয়ের পক্ষে এই পরিমাণ কোন জাতির আকৃতিগত তুলনা যথেষ্ট নয় (বঙ্গীয় জাতি ও বংশ, পৃষ্ঠা- ১৬৮)।
আবার পণ্ডিত এফ মুলার ব্রহ্মদেশ, আরাকান ও পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী জাতি মাত্রকেই “লৌহিতক” বংশ সম্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলবাসী প্রায় সমুদয় জাতির মূল শাখা লোহিত্য (লোহিত্য বা তিব্বতী-বর্মী (Tibeto-Burman) ভাষা ও জাতিগোষ্ঠী) নামান্তর ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ভূমি হতে আগত। অপরাপর নরতত্ত্ববিদগণ এঁদেরকে “তিব্বতীব্রহ্মা” নামে অভিহিত করেছেন (Alleghenies Ethnographic, Page- 405)।
চট্টগ্রামের ইতিহাস লেখক মাহবুবল উল হক তাঁর গ্রন্থে “তিব্বতীব্রহ্মা ও লোহিতক” শরীরের গঠন সম্পর্কে বলেছেন, এঁরা মধ্যমাকার সবল শরীর, ঈষৎ গৌরবর্ণ,নাসিকা চেপ্টা, চিবুক শ্মশ্রুহীন, বাহু-যুগল মাংসল, পাদগুচ্ছ মোটা ও সুদৃঢ়; স্বভাব মধুর, সুন্দর ও সারল্যপুর্ণ। এঁরা স্বাবলম্বী। তাঁরা আদিতে গাছ, পাথর পূজা করত।
ক্যাপ্টেন টি.এইচ.লুইন চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীবৃন্দ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, পার্বত্য আদিবাসীদের দৈহিক গঠন নিঃসন্দেহে মংগোলীয়ান। তাঁরা স্বাভাবিকভাবে দৈহিক আকৃতিতে খর্ব, উচ্চতা সারে পাঁচ ফুটের অধিক নয়। তাঁদের মুখাকৃতি প্রশস্ত, চ্যাপটা নাক, উপরের হাড় একেবারে সমান, ক্ষুদ্রাকৃতি দুটি চোখের অবস্থান মুখাবয়বের সাথে তীর্যক, গালের হনু উঁচু এবং কোন দাড়ি বা গোঁফ নেই। চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল ও সুন্দর এবং মুখের হাসি প্রফুল্ল ও অকপট যা তাঁদের সহজ সরল ও বিশ্বস্ত মনের বহিঃপ্রকাশ (ক্যাপ্টেন টি.এইচ.লুইন চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীবৃন্দ, ১৯৯৬ইংরেজী, পৃষ্ঠা- ৪৫)।হুমায়ুন আজাদ চাকমাদের শরীরের গঠন সম্পর্কে বলেছেন- আকালে খাটো, চুল কালো, চোখ সরু আর কপালে অস্থি উচ্চ।
ক্যাপ্টেন
টি. এইচ লুইন এর মতে, চাকমা
জাতিগোষ্ঠিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- খ্যয়ংথা, টংথা ও তঞ্চঙ্গ্যা। যাঁরা
নদীর তীরে বসবাস করে এবং তাঁদের আচার-আচরণের কারণে তাঁদেরকে খ্যয়ংথা শ্রেণিভূক্ত করেছেন। যাঁরা সমভূমি চাইতে উঁচু জায়গায় বসবাস করতেন তাঁদেরকে টংথা শ্রেণিভূক্ত করেছেন। তৃতীয় অংশটি হচ্ছে তঞ্চঙ্গ্যা। চাকমা জাতিগোষ্ঠির মিয়ানমারে (বার্মায়) “দৈংনাক’’
নামে বসবাস করে।
চাকমা ইতিহাস লেখক বাবু বিরাজ মোহন দেওয়ানের মতে, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, দৈননাক ও চাকরা বিভিন্ন সম্প্রদায়রুপে পরিচিত হলেও মূলত: একই চাকমা জাতি এবং সিলেট ইত্যাদি অঞ্চলের যাঁরা ‘‘উত্তরের চাকমা’’ রুপে পরিচিতি ছিলেন, তাঁরাও একই জাতির অর্ন্তভূক্ত (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত- বাবু বিরাজ মোহন দেওয়ান-১৯৬৯ইং, ৬৬-৬৭ পৃষ্ঠা)।
তঞ্চঙ্গ্যারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি নৃগোষ্ঠী, যারা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে বসবাস করে। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারেও তাদের বসতি রয়েছে, যেখানে তারা ‘দাইনাক’ নামে পরিচিত। নৃতাত্ত্বিকভাবে মঙ্গোলীয় হলেও তারা ইন্দো-আর্য ভাষা (পালি, প্রাকৃত ও আদি বাংলার মিশ্রণ) ব্যবহার করে।
কৃষিই তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান জীবিকা। বর্তমানে জুম চাষের পাশাপাশি তারা ফলজ বাগান ও সরকারি-বেসরকারি চাকরিতেও নিয়োজিত হচ্ছে। তঞ্চঙ্গ্যা সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে নারীদের সাত রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'পিনুইন' ও 'কাবর' এবং রূপার তৈরি অলংকার (যেমন- রাজ্জুর, চন্দ্রহার, হাচুলি) বেশ আকর্ষণীয়। পুরুষরা বর্তমানে আধুনিক পোশাকের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী জামাও পরিধান করেন।
সাহিত্যেও
ক্ষেত্রে সাধক কবি শিব চরণের ‘গসাইন লামা’ তঞ্চঙ্গ্যাদের আদি
সাহিত্য হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীকালে কবি পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা ও কবিরত্ন কার্ত্তিক
চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা এই সাহিত্যকে সমৃদ্ধ
করেছেন। এই জাতির উল্লেখযোগ্য
গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো, চিত্রশিল্পী রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা, জ্বরতী তঞ্চঙ্গ্যা এবং পরিমল চন্দ্র তালুকদার অন্যতম। নিজস্ব ভাষা, পোশাক ও কৃষ্টির মাধ্যমে
তঞ্চঙ্গ্যারা পার্বত্য অঞ্চলের এক অনন্য জাতিসত্তা
হিসেবে টিকে আছে।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বি,এ (অর্নাস) এম.এ, (চট্টগ্রাম বশ্বিবদ্যিালয়),অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম ও ড. অমর কান্তি চাকমা, বি,এ (অর্নাস) এম.এ, (চট্টগ্রাম বশ্বিবদ্যিালয়), পি.এইচ.ডি (মগধ বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত), প্রফসের, আদবিাসী গ্রীন্ডহার্ট স্কুল এণ্ড কলজে, ঢাকা।
তথ্যসূত্র বই সমূহ:
১।
চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবুত্ত)- সতীশ
চন্দ্র ঘোষ, ১৩১৬ বাংলা, ১-৬ পৃষ্ঠা।
২।
চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত- বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ ইংরেজী, পৃঃ- ২৫ ও ১৬০-৬৩ পৃষ্ঠা।
৩।
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তাঁর আদিবাসীবৃন্দ-
ক্যাপ্টেন টি.এ্ইটচ.লুইন,
বঙ্গানুবাদ, হিরহিত চাকমা- ১৯৯৬ইং, পৃ: ৭৯।
৪।
চাকমা সমাজ ও সংস্কৃতি, বঙ্কিম
চন্দ্র চাকমা, জুলাই ১৯৯৮ইং, ৯৬পৃষ্ঠা
৫।
চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ইং, পৃঃ ২৩৩-৩৮।
৬।
বঙ্গীয় জাতি ও বংশ- স্যার
রিজলী পৃষ্ঠা- ১৬৮।
৯।
Jumjournal, July 15th, 2020.
১০।
জাতক (১ম খ--৬ষ্ঠ
খ-) ঈশানচন্দ্র ঘোষ।
১১।
যোগেশ চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা : তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি (১৯৮৫), পৃ. ৯।
১২।
বাংলাদেশের আদিবাসী, পৃ. ৫৩।
১৩।
মহাপরিনির্বান সূত্র,
No comments