চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে সম্রাট অশোকের বৈশ্বিক অবদান
বিশ্ব ইতিহাসের দিগন্তবিস্তৃত আকাশে যে কজন সম্রাট তাঁদের শৌর্য, বীর্য এবং মানবিকতার দ্বারা ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে মৌর্য বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক অন্যতম। তিনি কেবল মগধের সিংহাসনের অধিপতি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক শান্তিকামী আদর্শের অগ্রদূত। খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতকে ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি যে মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছিলেন, তা আজ আড়াই হাজার বছর পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। সম্রাট অশোকের জীবন এক বিষ্ময়কর রূপান্তরের আখ্যান—তলোয়ারের আস্ফালন থেকে বুদ্ধের চরণে আত্মসমর্পণের এক মহাকাব্য।
অশোকের পরিচয় ও প্রারম্ভিক জীবন:
সম্রাট অশোক ছিলেন মৌর্য সম্রাট বিন্দুসারের পুত্র এবং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পৌত্র। তাঁর মাতা ছিলেন রানি সুভদ্রাঙ্গী। বিন্দুসারের অসংখ্য পুত্রের মধ্যে অশোক তাঁর প্রতিভা ও রণকৌশলের কারণে অনন্য ছিলেন। যৌবনে তিনি উজ্জয়িনী ও তক্ষশীলার শাসনকর্তা হিসেবে নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর এক রক্তাক্ত উত্তরাধিকার যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি সিংহাসন লাভ করেন। বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘দিব্যবদান’ ও সিংহলীয় উপাখ্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, অশোক তাঁর ৯৯ জন ভাইকে হত্যা করে কণ্টকাকীর্ণ পথে সিংহাসন আরোহণ করেছিলেন, যার কারণে তাঁকে ইতিহাসে 'চণ্ডাশোক' নামে অভিহিত করা হয়। সিংহাসনে বসার চার বছর পর তাঁর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয় এবং তিনি ‘দেবানাং প্রিয় প্রিয়দশী’ (দেবতাদের প্রিয় ও সুদর্শন) উপাধি গ্রহণ করেন।
কলিঙ্গ যুদ্ধ:
অশোকের জীবনের এবং বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৬১ অব্দের কলিঙ্গ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কলিঙ্গবাসীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মুখে অশোকের বাহিনী জয়লাভ করলেও সেই জয়ের মূল্য ছিল ভয়াবহ। ১ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, দেড় লক্ষ মানুষ বন্দী হয় এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ যুদ্ধপরবর্তী মহামারীতে প্রাণ হারায়। দয়া নদীর জল রক্তের স্রোতে লাল হয়ে উঠতে দেখে দিগ্বিজয়ী সম্রাটের হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। যুদ্ধের বীভৎসতা তাঁকে প্রবল অনুশোচনার সাগরে নিমজ্জিত করে। ঠিক সেই সময়েই তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে ‘নিগ্রোধ’ নামক এক সাত বছরের বালকের সাথে, যিনি ছিলেন এক বৌদ্ধ শ্রামণ। নিগ্রোধের শান্ত সৌম্য মূর্তিতে বুদ্ধের ‘অপ্রমাদ’ (অপ্রমত্ততা) বাণী শুনে অশোকের চিত্তে শান্তি নেমে আসে। তলোয়ার ত্যাগ করে তিনি বুদ্ধের চরণে শরণ নেন। চণ্ডাশোক রূপান্তরিত হন ‘ধর্মাসোক’-এ। তিনি ঘোষণা করেন— “অস্ত্রবিজয় অপেক্ষা ধর্মবিজয়ই প্রকৃত বিজয়।”
বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে অশোকের গৃহিত পদক্ষেপসমূহ:
সম্রাট অশোক কেবল নিজে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং একটি আঞ্চলিক ধর্মকে বিশ্বধর্মে পরিণত করার জন্য তিনি তাঁর রাজশক্তি ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর বহুমুখী অবদানসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ৮৪ হাজার বিহার ও স্তূপ নির্মাণ:
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, বুদ্ধের দেহাবশেষ বা ধাতু সংরক্ষণ এবং বৌদ্ধ দর্শনের বিকাশের জন্য সম্রাট অশোক সমগ্র ভারতজুড়ে ৮৪ হাজার বৌদ্ধ স্তূপ ও বিহার নির্মাণ করেছিলেন। সাঁচি স্তূপ ও সারনাথের ধর্মচক্র প্রবর্তন স্তম্ভ আজও তাঁর সেই স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় নিষ্ঠার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
২. ধর্মযাত্রা ও তীর্থভ্রমণ:
সিংহাসনে বসার দশম বছরে অশোক তাঁর ‘বিহার যাত্রা’ (শিকারে যাওয়া) বন্ধ করে ‘ধর্মযাত্রা’ শুরু করেন। তিনি বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী, বোধগয়া, সারনাথ এবং কুশীনগরের মতো পবিত্র তীর্থস্থানগুলো পরিভ্রমণ করেন। লুম্বিনীতে তিনি এক স্তম্ভ স্থাপন করেন এবং বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ সেই গ্রামের কর মওকুফ করেন।
৩. শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি স্থাপন:
জনসাধারণের মাঝে বুদ্ধের নীতি ও নৈতিকতা পৌঁছে দেওয়ার জন্য অশোক পাথর ও স্তম্ভের গায়ে ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে বুদ্ধের বাণী খোদাই করেন। তাঁর এই শিলালিপিগুলোতে তিনি অহিংসা, সত্যবাদিতা, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি এবং সকল ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতার উপদেশ দেন। কলিঙ্গ লিপিতে তিনি লিখেছিলেন— “সবে মুনিসে পজা মম” (সব মানুষই আমার সন্তান)। এই সর্বজনীন ঘোষণাটি আজও রাষ্ট্র পরিচালনার এক অনন্য আদর্শ।
৪. রাজকর্মচারী ও ‘ধর্ম মহামাত্র’ নিয়োগ:
ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তিনি ‘রাজুক’ ও ‘যুত’ নামক কর্মচারী নিয়োগ করেন। এছাড়া, প্রজাদের ধর্মীয় জীবন তদারকি করা এবং তাঁদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার জন্য ‘ধর্ম মহামাত্র’ নামক এক বিশেষ পদ সৃষ্টি করেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার ও মৈত্রী সুনিশ্চিত করা।
৫. তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি আহ্বান:
বৌদ্ধ সংঘের অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করতে এবং ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে সম্রাট অশোক খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ অব্দে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি বা সম্মেলনের আয়োজন করেন। প্রাজ্ঞ স্থবির মোগলিপুত্ত তিষ্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে থেরবাদ মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ‘ত্রিপিঠক’ এর চূড়ান্ত সংকলন সম্পন্ন হয়।
বিদেশে ধর্ম প্রচার ও বিশ্বায়ন:
সম্রাট অশোকের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অবদান হলো বৌদ্ধ ধর্মকে ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া। তিনি কেবল ভারত নয়, বরং তৎকালীন বিশ্বের প্রধান প্রধান সভ্যতাগুলোতে ধর্মদূত প্রেরণ করেছিলেন: সিংহলে (শ্রীলঙ্কা): তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে সিংহলে প্রেরণ করেন। সংঘমিত্রা সাথে করে বোধিবৃক্ষের একটি শাখা নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় সিংহল বৌদ্ধ ধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপ: তিনি গ্রিস, মিশর, মেসিডোনিয়া এবং সিরিয়ার রাজদরবারে দূত পাঠিয়েছিলেন। তাঁর লিপিতে গ্রিক রাজা আন্তিয়োকাস, তুরুমায়া (টলেমি) প্রমুখের উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও তিব্বত: অশোকের প্রচেষ্টায় ব্রহ্মদেশ (মায়ানমার), থাইল্যান্ড এবং তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটে। মহাবংশ অনুসারে, মঝঝান্তিক স্থবিরকে কাশ্মীর ও গান্ধারে এবং সোন ও উত্তর স্থবিরকে সুবর্ণভূমিতে (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) পাঠানো হয়েছিল।
জনহিতকর কার্যাবলী ও মানবিক আদর্শ:
অশোকের ধর্মপ্রচার কেবল তাত্ত্বিক ছিল না, তা ছিল কর্মমুখী। তিনি মানুষ এবং পশুপাখির চিকিৎসার জন্য পৃথক চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। রাস্তার ধারে ছায়াদানকারী বৃক্ষ রোপণ, কুয়া খনন এবং সরাইখানা নির্মাণ করেন। তাঁর দ্বাদশ শিলালিপিতে তিনি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা বলেছিলেন— *“অন্যের ধর্মকে অবজ্ঞা না করে নিজ ধর্মের উৎকর্ষ সাধন করা এবং সকল ধর্মের সারকথা শ্রবণ করাই হলো ধর্মের সারমর্ম।”*
উপসংহার: সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল ছিল প্রজ্ঞা, করুণা ও শান্তির এক স্বর্ণযুগ। ঐতিহাসিক এইচ.জি. ওয়েলস তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন— *“ইতিহাসের পাতায় হাজার হাজার রাজার ভিড়ে অশোকের নাম একাকী নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।” অশোকের প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায় থেকে বিশ্বধর্মে রূপান্তরিত হয়। তাঁর প্রবর্তিত শান্তি ও অহিংসার নীতি আজও আধুনিক বিশ্বের পাথেয়। সারনাথের যে ‘সিংহ শীর্ষ’ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা আজ স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীক। তাঁর ‘ধর্মচক্র’ আমাদের জাতীয় পতাকায় স্থান পেয়ে শান্তির বার্তা ঘোষণা করছে। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে অশোকের অবদান কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং তা মানব সভ্যতার এক পরম প্রাপ্তি। যতদিন বিশ্বে শান্তি ও মৈত্রীর নাম উচ্চারিত হবে, সম্রাট অশোকের নাম ততদিন মানুষের হৃদয়ে চিরঅম্লান থাকবে।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।

No comments