প্রাচীন ভারতে বুদ্ধের বংশীয় শাক্য ও কোলিয় বংশের পরিচিতি
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে শাক্য ও কোলিয় বংশ দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ক্ষত্রিয় বংশ। বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের সাথে এই দুই বংশের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শাক্য বংশের উৎপত্তি ইক্ষাকু বা সূর্য বংশ থেকে এবং তাদের রাজধানী ছিল কপিলাবস্ত। অন্যদিকে, কোলিয়দের প্রধান কেন্দ্র ছিল দেবদহ ও রামগ্রাম। শাক্য ও কোলিয় বংশের মধ্যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তারা সাধারণত নিজেদের গন্ডির বাইরে বিবাহ করত না, তবে এই দুই বংশের মধ্যে নিয়মিত বৈবাহিক আদান-প্রদান চলত। গৌতম বুদ্ধের মাতা মায়াদেবী, বিমাতা মহাপজাপতি গৌতমী এবং পত্নী যশোধরা- সবাই ছিলেন কোলিয় বংশের রাজকন্যা। এই নিবিড় সম্পর্কের কারণে তারা একে অপরের পরম আত্মীয় হিসেবে বিবেচিত হতো। ঐতিহাসিকভাবে, এই দুই বংশের মধ্যে একবার রোহিনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে তীব্র বিবাদ দেখা দিয়েছিল, যা গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং অহিংসার বাণীর মাধ্যমে মীমাংসা করেছিলেন। তবে বুদ্ধেও শেষ জীবনে কোশলরাজ বিড়ূঢ়ভের নৃশংস আক্রমণে কপিলাবস্তু ধ্বংস হয় এবং শাক্য বংশের বিশাল এক অংশ গণহত্যার শিকার হয়। এই বিপর্যয় থেকে যারা বেঁচে ফিরেছিলেন, তারা ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। শাক্য ও কোলিয়দের এই ইতিহাস বীরত্ব, ত্যাগ এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অম্লান দলিল।
শাক্য ও কোলিয় বংশের উৎপত্তি:
কথিত আছে, আদি কল্পের লোকেরা শৃংখলাবদ্ধ জীবন যাপনের মানসে নিজেদের মধ্যে একজন সামর্থবান, বিজ্ঞ ও ন্যায়পরায়ণ লোককে সর্ব সম্মতি ক্রমে নেতা নির্বাচিত করেন। তাঁকে করা হল সমস্ত জমির মালিক। বিভিন্ন লোক নিজ নিজ সামর্থ ও প্রয়োজনানুযায়ী জমির চাষ করত এবং ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ এই সর্বজন মান্য নেতাকে দিত। তিনি প্রতিদানে ঐ ক্ষেত্র সমূহের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং বিজ্ঞতা ও ন্যায় পরায়ণতার সাথে তাদের মধ্যে সর্ব প্রকার শৃংখলা রক্ষা করতেন। তিনি সকলের দ্বারা সম্মানিত হতেন বলে তাঁর নাম হল “মহাসম্মত”। তিনি ছিলেন যাবতীয় ক্ষেত্রের মালিক ও রক্ষক, তাই তাঁকে বলা হত ক্ষেত্র রক্ষক বা ক্ষত্রিয়। বিজ্ঞতা ও ন্যায় পরায়নতার সাথে তিনি প্রজাদের সুখ শান্তি বিধান করতেন বলে তাঁকে বলা হত রাজা। মানব সমাজে আদি রাজা মহাসম্মতের বংশধরেরাই ক্রমান্বয়ে ক্ষত্রিয়রুপে রাজ্য শাসন করে এসেছে।
মহাসম্মতের বহু বহু যুগ পরে “মহেশ্বর সেন” নামে এক রাজার বংশধরেরা কুশীনগর এবং “পোতলা” (কোশল) রাজ্যে রাজত্ব করতেন। তৎমধ্যে একজনের নাম ছিল রাজা কর্ণিক। কর্ণিকের গৌতম ও ভরদ্বাজ নামে দুই পুত্র ছিল। তাই তিনি পিতার অনুমতি নিয়ে ধর্ম সাধনার জন্য প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে কৃঞ্চবর্ণ নামক এক ঋষির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন পরে রাজা কর্ণিকের মৃত্যু হলে ভরদ্বাজই পোতলের সিংহাসনে আরোহণ করেন। গুরুর উপদেশানুযায়ী মহাত্মা গৌতম পোতল রাজ্যের সীমার মধ্যে এক পর্ণ কুটির নির্মাণ করে ধ্যান ধারণায় দিনাতিপাত করতে থাকেন। ঘটনাক্রমে ঋষির এই পর্ণ কুটিরের নিকটেই “ভদ্রা” নামে পোতলের এক নগর নন্দিকা তার জনৈক প্রণয়ী কর্তৃক নিহত হয় এবং আততায়ী কর্তৃক রক্তাক্ত ছুরিকাখানাও কুটিরাভ্যন্তরে নিক্ষিপ্ত হয়। সন্দেহ ক্রমে নগর বাসীরা ঋষি প্রবরকে বন্দী করে শাস্তি স্বরূপ তাঁকে ছিন্ন বস্ত্র পরিয়ে ও গলায় করপির (কবরী) ফুলের মালা দিয়ে সমস্ত নগর পরিভ্রমণ করায় এবং নগরের বাইরে নিয়ে গিয়ে তাঁকে শূলে দেওয়া হয়। তদীয় গুরু ঋষি কৃঞ্চবর্ণ এখনই কনকবর্ণ হোক। একথা বলার পর সঙ্গে সঙ্গে ঋষি কণকবর্ণ ধারণ করল এবং তখন হতে তাঁর নাম হল “ কণকবর্ণ ”। ঋষি গৌতম তাঁর গুরুদেবকে আরও জানালেন যে তাঁর নিজের এই অকাল মৃত্যুর জন্য তিনি মোটেই দুঃখিত নন। তবে তাঁর ভ্রাতা ভরদ্বাজের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর মৃত্যুর পর পোতলের সিংহাসন থাকবে না, এটিই তাঁর একমাত্র দুঃখ। ঋষি কণকবর্ণ শিষ্যের অভিপ্রায় জ্ঞাত হয়ে তপোবলে এক ভীষণ ঝড় বৃষ্টি সৃষ্টি করলেন, যার ফলে গৌতমের বেদনা প্রশমিত হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয় সতেজ হয়ে উঠল ও তাঁর দেহ থেকে দুই বিন্দু রক্তমিশ্রিত বীর্যপাত হল। কিছুক্ষণ পরে এই দুই বিন্দু বীর্য দুটি ডিম্বে পরিণত হয়। এবং সূর্যের তাপে যথা সময়ে ডিম ভেঙ্গে দুটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। শিশুদ্বয় আত্মরক্ষার্থে নিকটবর্তী ইক্ষুক্ষেত্রে প্রবেশ করে সূর্যের দ্বারা বর্দ্ধিত হতে থাকে এবং ঋষি গৌতম শূলবিদ্ধ অবস্থায় সূর্যতাপে শুকিয়ে দেহ ত্যাগ করেন।
ঋষি কণকবর্ণ পরে গৌতমের এই সন্তানদ্বয়কে নিজ আশ্রমে নিয়ে গিয়ে প্রতিপালন করেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে জন্ম এবং সূর্য কিরণে বর্দ্ধিত হওয়াই তাঁদের বল হয় ‘সূর্যবংশ’। ঋষি গৌতমের পুত্র বলে গৌতম, তাঁর কটিদেশ নিঃসৃত অঙ্গরস থেকে জাত বলে অঙ্গিরস এবং ইক্ষু ক্ষেত্রে বর্দ্ধিত ও প্রাপ্ত বলে তাঁদের অপর নাম “ইক্ষাকু” অপুত্রক রাজা ভরদ্বাজের মৃত্যুর পর তাঁর মন্ত্রীবর্গ ঋষি গৌতমের কোন পুত্র সন্তান আছে কিনা জানতে চাইলে ঋষি কণকবর্ণ তাঁদের সমস্ত কাহিনী বলেন। তখন তাঁরা দুই ভাইকে নিয়ে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে রাজা রূপে বরণ করেন। তিনিও অপুত্রক অবস্থায় দেহ ত্যাগ করলে কনিষ্ঠ ভাই ইক্ষাকু নাম নিয়ে রাজত্ব করেছেন। অতঃপর তদ্বংশীয় একশত জন রাজা ক্রমান্বয়ে পোতল বা কোশল রাজ্য রাজত্ব করেছেন। তৎমধ্যে সর্বশেষ রাজা ইক্ষাকু বিরুরকের পুত্রগণই শাক্য বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
কোলিয় বংশের পরিচিতিঃ
বারাণসী রাজ্যে ‘কোল’ নামে এক রাজা ছিল। সে যে কোনো রমণীকে আকর্ষণ করতে পারতেন বলে নিজের শারীরিক লাবণ্য ও অঙ্গ সৌষ্ঠব সম্পর্কে তাঁর মনে অহংকার ছিল। এই অহংকার চূর্ণীকৃত করে কালক্রমে তাঁর দেহে কুষ্ঠ রোগ দেখা দিল। জঘন্য রোগের আক্রমণে অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গাদি কোবিলার পুষ্পের ন্যায় দেখাতে লাগল। ঘৃনায় নাক সিঁটকে সরে পড়ল একে একে তাঁর নর্তকী ও সহচরীবৃন্দ। তাঁদের স্বর্ণ,রৌপ্যের প্রলোভনে আটকে রাখতে পারল না। হতাশ হয়ে তিনি ফিরে চললেন, অন্তঃপুরে একই দৃশ্যের পুনরাভিনয় দেখতে পেলেন। মহিষীরা কেউই রাজার ছায়া মাড়াতে সাহস পেলেন না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এ জঘন্য রোগের ছোঁয়া এড়াতে। কেননা, রাজার সঙ্গে আহারে-বিহারে শয়নে-গমনে ও উপবেশনে যে কোন লোকের দেহে এ কালব্যাধি সংক্রমিত হয়ে যেতে পারে। নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অনভ্যস্ত রাজা ক্রমে বীতস্পৃহ হয়ে পড়লেন। রাজকীয় ভোগৈশ্বর্য ও বিলাস ব্যসনের মায়া কাটিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় বনে গমন করতে সঙ্কল্প গ্রহণ করলেন। অচিরে তিনি জ্যেষ্ঠ পুত্রের হস্তে রাজ্য ভার অর্পন করে একাই গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করতে লাগলেন, দৈবক্রমে ঐ বন্য লতাপাতার মধ্যেই ছিল তাঁর ঘৃণ্য রোগের প্রতিষেধক ঔষধি। নিজের অজ্ঞাতসারে এই ঔষধ খেয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে রোগ মুক্ত হয়ে পড়লেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর হৃত স্বাস্থ্য সম্পদ এবং রূপ লাবণ্যও ফিরে পেলেন।
বনপথে বিচরণ করতে করতে তিনি এক প্রকা- বৃক্ষ কোটর দেখতে পেলেন। তিনি এটিকে কেটে ছেঁটে মনুষ্য বাসোপযোগী করে তাতে দরজা জানালা সংযুক্ত করলেন। নীচে আগুন জ্বেলে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বৃক্ষ কোটরে উঠে তথায় তিনি রাত্রি যাপন করতেন এবং সিংহ, ব্যাঘ্রাদি, নিশাচর হিংস্র জন্তু সমূহের শব্দ লক্ষ্য করে ভোর বেলায় তাদের উচ্ছিষ্ট মাংসাদি সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলো অগ্নিপক্ক করে ভোজন করতেন। একদিন শেষ রাত্রে তিনি অগ্নি জ্বেলে বসে আছেন, এমন সময়ে অদূরবর্তী গভীর বন থেকে এক বাঘের গর্জন শুনতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হল যেন একটি স্ত্রী লোকের কন্ঠের আর্তনাদ ভেসে আসল। অতি ভোরে তিনি উভয় শব্দের তাৎপর্য নির্ণয়ে বহির্গত হলেন। খুজঁতে খুজঁতে যথা স্থানে এসে তিনি পর্বত গাত্রে সদ্য খনিত এক গর্ত দেখতে পেলেন। নিম্নে মৃত্তিকোপরি ব্যাঘ্র পদচিহ্ন। তখন তাঁর আর বুঝতে বাকী রইল না যে, এই গর্তে মানুষ আছে এবং মানুষের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ব্যাঘ্র এই গর্ত খনন করতে আরাম্ভ করেছিল। কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় মুখের গ্রাস ফেলেই তাকে আত্মগোপন করতে হয়েছে।
যাই হোক তিনি গর্ত মুখে উচ্চ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন- গর্তের ভিতরে কে? নারীর কন্ঠে উত্তর হল আমি একজন স্ত্রীলোক। তোমরা কোন জাতি? আমি রাজা ইক্ষাক্ষুর কন্যা। তুমি গর্তের মধ্যে কেন ? আমি কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত বলে। তুমি এখানে কি করে এলে? আমার কুষ্ঠ রোগ হলে আমার সংস্পর্শে অন্যদের শরীরের ইহা সংক্রমিত হতে পারে বলে আমার ভাইয়েরা আমাকে এখানে এনে আমার আহারোপযোগী প্রচুর খাদ্য সামগ্রী দিয়ে এই গর্তের মুখ বন্ধ করে চলে যায়। তোমার ভাইয়েরা কোথায়? অকালে আমাদের মাতৃবিয়োগ হলে পিতৃদেব দ্বিতীয়বার পানি গ্রহণ করেন। কালক্রমে নতুন মায়ের এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে তিনি রাজার নিকট নিজ পুত্রের রাজ্যভিষেক প্রার্থনা করেন। পিতৃদেব সপত্নী পুত্রদের প্রতি তাঁর বিরুপ মনোভাব বুঝতে পেরে তাঁর মৃত্যুর পর রাজ্য ভার গ্রহণ করার উপদেশ দিয়ে বনে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা হিমালয়ে নিকটে মহাত্মা কপিল মুনির সম্মতি ক্রমে তাঁরই আবাস স্থানে কপিলাবস্তু এক নগরী পত্তন করে তথায় বাস করতে থাকে। রক্ত সংমিশ্রনের ফলে বংশের পবিত্রতা ক্ষুন্ন হবার ভয়ে তাঁরা নিজের ভাই বোনদের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন করেছে। কেবল আমি সকলের বড় বলে আমাকে তারা মাতৃস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই আমি এযাবৎ কুমারী। তখন রাজা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি বারাণসী রাজ ‘কোল’। কাজেই আমা হতে তোমার কোন ভয় নেই। তাছাড়া আমারও কুষ্ঠ রোগ হয়েছিল, আমি বন্য লতা-পাতা খেয়েই এখন সুস্থ হয়েছি। সে সমস্ত ঔষধি আমার জানা আছে। তুমি গর্ত থেকে বেরিয়ে এলে ঐ সমস্ত ঔষধির সাহায্যে তোমাকেও আমি সুস্থ করতে পারি।
তখন স্ত্রীলোক বললেন- মহারাজ গর্তের মুখ থেকে আমি অনেক নীচে। কি করে আমি উঠে আসব? বারাণসী রাজা কোল তখন নিজের বৃক্ষ কোঠরে ফিরে গিয়ে তাঁর সিঁড়ি খানি নিয়ে এসে গর্তমুখে নামিয়ে দিলেন। তাই বেয়ে কুমারী প্রিয়া গর্ত থেকে উঠে এলেন। অতঃপর রাজা তাঁকে পূর্বোক্ত লতা-পাতা ইত্যাদি খাইয়ে সুস্থ করলেন। ধীরে ধীরে তিনিও হৃতস্বাস্থ্য ফিরে পেলেন এবং সুবর্ণ লাভ করলেন। রাজা কোলের সঙ্গে সহবাসের ফলে ক্রমে তাঁর গর্ভ সঞ্চার হল এবং তিনি দুটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। এভাবে ষোড়শ গর্ভে তাঁদের বত্রিশটি পুত্র হয়। রাজার শিক্ষায় ক্রমে তাঁরা সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন।
এ সময়ে বারাণসী রাজ্যের জনৈক প্রজা এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় রাজাকে দেখতে পেলেন এবং সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হলেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে সে রাজাকে এই কাহিনী জানালে রাজা পিতাকে রাজ্যে ফিরে আনার জন্য চতুরঙ্গিনী সেনাসহ বনে উপস্থিত হলেন। কিন্তু বৃদ্ধ রাজা স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করতে অস্বীকৃত হলেন এবং তিনি যে বৃক্ষ কোটরে বাস করতেন সে বৃক্ষটিকে উপড়ে ফেলে তৎস্থলে নতুন নগর প্রতিষ্ঠা করতে আদেশ দিলেন। রাজার আদেশে অল্প দিনের মধ্যে মনোরম নগর প্রতিষ্ঠিত হল। বৃদ্ধ রাজার নামানুসারে এটি ‘কোল’ নগর নামে অভিহিত হয়। কারও কারও মতে কোল বৃক্ষ উপড়ে ফেলে নগর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে এর নাম হয় ‘কোল নগর’। অতঃপর বারাণসী রাজ পিতার সুখ স্বাচ্ছন্দের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেন।
শাক্যবংশের পরিচিতিঃ
বৌদ্ধ সাহিত্যে পড়ে জানা যায়, শাক্যবংশ ইক্ষাক্ষুর বংশ হতে উৎপত্তি। শাক্যবংশের আদি বসতি ছিল ভারতবর্ষে কপিলাবস্তু নগরে। কপিল মুণির নামানুসারে কপিলাবস্তু নামকরণ করা হয়েছে। শাক বা শাল বৃক্ষের নিচে বসতি স্থাপন করেছিল বলে শাক্যবংশ নামে অভিহিত হন।
অশ্বঘোষ বলেছেন, “শক” নামে এক রকম বৃক্ষ আছে, সেই গাছের ঘেরায় যারা বাস করেন, তাঁরা শাক্য নামে খ্যাত। কারও কারও মতে, “স্বকীয়” শব্দ হতে শাক্যবংশ শব্দটির উৎপত্তি। এ শাক্যবংশ সূর্যবংশ হতে উৎপত্তি। একে ইক্ষাকু বংশও বলা হয়।
বুদ্ধ নিজে বলেছেন, অনেক অনেক দিন পূর্বে আমাদের এই পাক ভারত উপমহাদেশ জম্বুদ্বীপ নামে পরিচিত । সম্ভবতঃ এই ভূখ-ে বহু সংখ্যক জম্বুবৃক্ষ জন্মাত বলে একে জম্বুদ্বীপ বলা হত। জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত কোশল রাজ্যে ইক্ষাকুর বংশীয় রাজা বিরুরক রাজত্ব করেন। তাঁর প্রধান মহিষী ‘ভর্ত্তার’ গর্ভে কুমার উল্কামুখ, করকর্ণ, হস্তীনায়ক ও নূপুর নামে চার পুত্র এবং কুমারী প্রিয়া, আনন্দা, বিজিতা, বিজিত এবং সেনা নামে পাঁচ কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন।
অতঃপর প্রধান মহিষীর মৃত্যু হলে রাজা আরো এক সুন্দরী যুবতী রাজকন্যার পানি গ্রহণ করতঃ পাটরাণী পদে অধিষ্ঠিত করেন। কালক্রমে এই পাটরাণীর গর্ভে জন্ত কুমার নামে এক পুত্র জন্ম গ্রহণ করলে রাণী পঞ্চম দিবসে পুত্রকে উত্তম রুপে সজ্জিত করে রাজাকে দেখান। রাজা পুত্রের মুখ সর্ন্দশনে অতিশয় আনন্দিত হয়ে পাটরাণীকে একটি বর দিতে ইচ্ছে করেন। পাটরাণী তাঁর স্বজন বর্গের সাথে পরামর্শ করে স্বীয় পুত্রের রাজ্যাভিষেক প্রার্থনা করেন। এতে রাজা ভীষন ক্রুদ্ধ হন এবং রানীকে তাঁর স্বার্থপরতার জন্য কঠোর ভাবে তিরস্কার করেন। রাণী কিন্তু এতে কিছু মাত্র দমলেন না। তিনি দিন রাত রাজাকে নির্জনে সত্য রক্ষার জন্য অনুরোধ ও সত্য ভঙ্গের অযৌক্তিতা সম্পর্কে অবহিত করতে থাকেন। অবশেষে বিরক্ত হয়ে নিজ পুত্রগণকে সম্বোধন করে বললেন- বৎসগণ তোমাদের সর্ব কনিষ্ঠ ভাই জন্ত কুমারকে দেখে আমি তার মাকে একটি বর দিতে ইচ্ছা করি। এখন সে তার পুত্রের রাজ্যোভিষেক কামনা করছে। সুতরাং তোমরা ইচ্ছানুযায়ী হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতিক, সৈন্য, সামন্ত ইত্যাদি নিয়ে বনে গমন কর এবং আমার মৃত্যুর পর প্রত্যাবর্তন করে রাজ্য শাসন কর। এই বলে তিনি আট জন মন্ত্রী সঙ্গে দিয়ে তাঁদের বনে পাঠিয়ে দেন।
রাজ কুমারেরা শোকাকুল হৃদয়ে পিতার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সবাইয়ের নিকট বিদায় নিয়ে ভ্রাতা ও ভগ্নীগণ চতুরঙ্গিণীসেনাসহ রাজধানী ছেড়ে চললেন। কুমারেরা রাজার মৃত্যুর পর ফিরে এসে পুনরায় রাজ্য ভার গ্রহণ করবেন এই মনে করে বহুলোক রাজকুমারদের সেবা করার উদ্দেশ্যে তাদের অনুগামী হলেন। সৈন্যদলসহ তাঁরা প্রথম দিনে একযোজন, দ্বিতীয় দিনে দুই যোজন এবং তৃতীয় দিনে তিন যোজন পথ অতিক্রম করলেন। অতঃপর তাঁরা নি¤েœাক্তরুপে পরামর্শ করলেন আমাদের জনবল বিরাট। যদি আমরা পার্শ্ববর্তী কোন রাজাকে পরাস্ত করে তাঁর রাজ্য দখল করি তাতে আমাদের সকলে স্থান সংকুলান হবে না।
সুতরাং কেন আমরা অন্যদের ওপর অনর্থক অত্যাচার করব? প্রকা- দেশ এই জম্বুদীপ। বনের মধ্যেই আমরা নিজদের জন্য একটি নগর প্রতিষ্ঠা করব। এই সিদ্ধান্ত করে তাঁরা হিমালয়ের দিকে অগ্রসর হয়ে নগর প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত স্থান অনুসন্ধান করতে লাগলেন। সেই সময়ে বোধিসত্ত্ব এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন এবং কপিল নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ের সানুদেশে এক পদ্ম সরোবরের তীরে শাক বা শালবনে পর্ণকুটির নির্মাণ করে বাস করছিলেন।
কপিল ভূতত্ত্বে পারদর্শী ছিলেন বলে ভূমি ভাগের দোষ গুণ জানতে পারতেন। এই স্থান পৃথিবীর সর্ব দোষ মুক্ত শ্রেষ্ঠ স্থান বলে জেনে তিনি তার পর্ণকুটির নির্মাণ করেছিলেন। নগর প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত স্থানের অনুসন্ধানরত রাজ কুমারদের সাথে সাক্ষাৎ হলে, তিনি তাঁদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে বললেন, এই পর্ণকুটিরের ভিত্তি ভূমির উপরে নির্মিত নগরী সমগ্র জম্বুদ্বীপ শ্রেষ্ঠ নগরীতে পরিণত হবে। এখানে যারা জন্মাবে তাঁদের মধ্যে একজন শত সহস্র লোককে পরাস্ত করতে সমর্থ হবে। এখানে তোমরা নগর প্রতিষ্ঠা কর এবং এই পর্ণকুটিরের স্থানে রাজ প্রাসাদ নির্মাণ কর। কেননা, এখানে জাত একজন চন্ডাল পুত্রও যে কোন রাজ চক্রবর্তীর চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী হবে। তাঁর নির্দেশ মত কুমারেরা পর্বতের সানুদেশে তাঁরা বাসের জন্য একটি পর্ণকুটির নির্মাণ করে দিলেন এবং প্রথমোক্ত পর্ণকুটিরের স্থানে নগর প্রতিষ্ঠা করে তার নাম দিলেন ‘কপিলাবস্তু’।
নগর প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হলে মন্ত্রীবৃন্দ কুমারদের পিতার অনুপস্থিতি হেতু নিজেদের দায়িত্ববোধে তাঁদের বিবাহের আয়োজনে মন দিলেন। কিন্তু কুমারগণ বললেন আমাদের মত কুলীন বংশ মর্যাদা সম্পন্ন কোন ক্ষত্রিয় কন্যা বা রাজপুত্র দেখতে পাচ্ছি না, যাঁদের সঙ্গে আমাদের বৈবাহিক সম্বন্ধ হতে পারে। অসমবর্ণ বিবাহ হতে জাত আমাদের পুত্র কন্যাগণ হয় মাতার দিক হতে নতুবা পিতার দিক হতে নিকৃষ্ট হবে। সুতরাং, বংশের পবিত্রতা বজায় রাখতে হলে আমাদের ভগ্নিদের সঙ্গে আমাদের বিবাহ সম্বন্ধ হওয়া বাঞ্চনীয়। এই সিদ্ধান্ত করে জ্যেষ্ঠ ভগ্নিকে তাঁরা মাতৃস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতঃ চার ভাই অবশিষ্ট চার ভগ্নিকে বিবাহ করলেন। ক্রমে পুত্রকন্যা হয়ে তাঁদের বংশবৃদ্ধি হতে লাগল। রাজা ইক্ষাকু নিজ পুত্রদের এই কীর্তি কাহিনী শুনে আবেগ ভরে বলে উঠেছিলেন কুমারগণ বাস্তবিকই শক্য অর্থাৎ সামর্থ্য সম্পন্ন এই শক্য কথা হতে ক্রমে তাঁরা শাক্যবংশ নামে পরিচিত হন।
কারও কারও মতে, আপন ভাই বোনের মিলন হতে উৎপন্ন বলে স্বকীয় শব্দ হতে তাঁরা শাক্যবংশ এই অভিধা প্রাপ্ত হন। আবার কেউ কেউ বলেন, শাক বা শালবনে নগর পত্তন করে বাস করেছিলেন বলে তাঁদের শাক্যবংশ বলা হত। অপর দিকে তাঁদের বড় ভগ্নি প্রিয়া কর্মের বিপাক হেতু কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হলে অন্যের শরীরে এটি যাতে সংক্রমিত হতে না পারে, সেজন্য তাঁর ভাইয়েরা গভীর বনে নিয়ে গিয়ে পর্বত গাত্রে গর্ত করে, সেখানে আহারোপযোগী প্রচুর খাদ্য দিয়ে খনন করা গর্তের ভিতর রেখে যায়।
শাক্য ও কোলীয় বংশের বৈবাহিক সম্পর্কঃ
কালক্রমে কুমারেরা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে মাতা ‘প্রিয়া’ তাঁদের বললেনÑ কপিলাবস্তু নগরে যেসব শাক্যরা বাস করেন তাঁরা সস্পর্কে তোমাদের মাতুল হন। তাঁদের মেয়েরাও তোমাদের মতই পোষাক পরিধান করে এবং তাঁদের চুলের গড়নও তোমাদেরই অনুরূপ। তাঁরা স্নান করার জন্য ঘাটে আসলে তোমরা তোমাদের পছন্দ মত এক এক জনকে বেছে নেবে। এদিন শাক্য কন্যারা স্নানের পরে জল শুকাচ্ছিল এমন সময়ে কোল রাজার পুত্রেরা এসে তাঁদের আপন আপন পছন্দমত বত্রিশটি শাক্য কন্যা পছন্দ করে নিজেদের পরিচয় দিয়ে চলে আসে। অবশিষ্ট শাক্য বংশধরেরা এই সংবাদ তাঁদের পিতা ও পিতৃব্যদের জানাল। শাক্যগণ কোলিয়রা তাঁদের স্ব-গোত্রীয় জেনে নিরবে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। এভাবে কোলিয় বংশ উৎপত্তি হয়। শাক্য ও কোলিয় বংশের মধ্যে পরস্পর বিবাহ সম্বন্ধ গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক কাল পর্যন্ত চলে এসেছিল। শাক্যবংশের মূলধারা কপিলাবস্তুতে রাজত্ব করলেও স্থানাভাব ইত্যাদি নানা কারণে বিভিন্ন শাখা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পত্তন হয়েছিল।
পালি সাহিত্যে চাতুমা, রাম গ্রাম, উল্লম্পা, শীলবতী ইত্যাদি কয়েকটি শাক্য নগরের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। তৎমধ্যে একটি নগরকে দেবদেহ বলা হত। আবার কারও কারও মতে এখানে উৎসবের সময় শাক্য রাজাগণ ক্রীড়া করতেন বলেই ইহার নাম হয় রাজহ্রদ বা দেবদহ। পালিতে ‘দেব’ অর্থ রাজা। সে যাই হোক কপিলাবস্তুতে যখন শাক্যরাজ জয়সেনের পুত্র সিংহ হনু দেবদহ শাক্যের কন্যা কচ্চানী বা কাত্যায়নীকে বিবাহ করেন। কালক্রমে সিংহ হনু’র শুদ্ধোদন, ধৌতদন শুক্লোদন এবং অমিতোদন নামে চার পুত্র এবং অমিতা ও প্রমিতা দুই কন্যা জন্ম হয়। এদিকে অঞ্জনের দ-পানি ও সুপ্রবুদ্ধ নামে দুই পুত্র এবং মায়া ও প্রজাপতি নামে দুই কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। কুমার শুদ্ধোদন বয়ঃপ্রাপ্ত হলে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হন এবং রাজা সিংহ হনু’র পুত্র বধূরূপে বরণ যোগ্য সর্বসুলক্ষণা কন্যা অনুসন্ধান করার জন্য মন্ত্রীবর্গকে আদেশ করেন। মন্ত্রীগণ নানা রাজ্য ঘুরে দেবদহ রাজা অঞ্জনের জ্যেষ্ঠ কন্যা মায়া দেবীই সর্বসুলক্ষনা বলে জানালেন।
তখন সিংহ হনু নানা উপটৌকনসহ যুবরাজ শুদ্ধোদনের সাথে মায়া দেবীর বিবাহ প্রস্তাব পাঠালেন। সিংহ হনু শাক্য রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য শাক্য রাজারা তাঁর সামন্ত মাত্র। কাজেই পবিত্র শাক্য বংশের মূল ধারার শ্রেষ্ঠ রাজা বীর কেশরী সিংহ হনুর সাথে বিবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারলে জম্বুদ্বীপের যে কোন রাজা নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করত। তাই রাজা অঞ্জন এই প্রস্তাব পেয়ে আনন্দিত হয়ে মায়দেবী ও মহাপ্রজাপতি এই দুই কন্যাকে যুবরাজ শুদ্ধোদনের হাতে তুলে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু শাক্য রাজ্যে এক স্ত্রী বিদ্যমানে কোন পুরুষের পক্ষে দ্বিতীয়া স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ থাকায় শুদ্ধোদন প্রথমে কেবল মায়াদেবীকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করলেন। রাজ্যে প্রজারা সকলে যে যার অবস্থানুযায়ী সুখে ও শান্তিতে দিনাতিপাত করছিল। কেবল শান্তি ছিলনা রাজা সিংহ হনুর মনে। কেননা পুত্রে বিবাহের পর বেশ কয়েক বৎসর গত হলেও তাঁর সন্তান সন্ততি হওয়ার কোন লক্ষণ নেই।
বংশ রক্ষার জন্য শাস্ত্রে মতে, শান্তি স্বস্ত্যয়ন যাগ যজ্ঞাদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। রাজার অশান্তি যেন ক্রমে রাজ্যের বিস্তার লাভ করল। এদিকে প্রত্যন্ত দেশে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠল। এ বিদ্রোহের পশ্চাতে ছিল পা-ুর বংশীয় পার্বত্য জাতির সাম্রাজ্য লোলুপতা, শাক্যগণ প্রমাদ গুনল এবং সমগ্র শাক্যের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। বিশেষতঃ বীর কেশরী রাজা সিংহ হনু আজ অশীতি পর বৃদ্ধ, কে রোধিবে এই বিদ্রোহ? কে করবে এই সঙ্কটের মোকাবিলা ? মানসিক অশান্তিতে ম্রিয়মান ও বার্দ্ধক্য পীড়িত রাজা সিংহ হনু প্রজাদের অনুরোধে শুদ্ধোদনকে এই বিদ্রোহ দমন করতে পাঠালেন। শুদ্ধোদন পিতার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে জীবন পণ করে বিদ্রোহ দমনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বীর বিক্রমে সংগ্রাম করে অপূর্ব কৌশলে তিনি বিদ্রোহীদের করায়ত্ত করলেন। ইহাতে সমগ্র রাজ্যে আনন্দের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শাক্যগণ একবাক্যে যুবরাজ শুদ্ধোদনের এই অমিত সাহস ও বীরত্বের পুরস্কার স্বরূপ শাক্যগণ তাঁকে বংশ রক্ষার জন্য দ্বিতীয়বার বিবাহ করার অনুমতি দিলেন। শুদ্ধোদনও পিতৃ নিদের্শে মায়াদেবীর সাথে পরামর্শ করে আট কুঁড়ে নাম ঘুছাবার আশায় মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে বিবাহ করেন এবং যুবরাজ শুদ্ধোদন সর্বসম্মতিক্রমে পিতৃ সিংহাসনে আরোহণ করেন। শুদ্ধোদনের ঔরসে মায়াদেবীর গর্ভজাত সন্তান হলেন সিদ্ধার্থ বা গৌতম বুদ্ধ।
মহামানব গৌতম বুদ্ধ:
শুভ বৈশাখী পূর্ণিমায় ৬২৩ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ রাজপুত্র সিদ্ধার্থ জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রজাবৃন্দ সকলের সর্বার্থ সিদ্ধ হওয়ায় নাম রাখা হয় ‘সিদ্ধার্থ’। বিশ্বামিত্র মুনি ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু। তিনি এই গুরুর নিকট বেদ, সাংখ্য, যোগ, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ শাস্ত্র, শব্দ-প্রকরণ, ছন্দ-প্রকরণ, ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এছাড়াও অশ্বারোহণ, রথচালনা, ধনুবিদ্যা, অসিবিদ্যা শিক্ষা করেন। এসব বিদ্যায় পারদর্শীতায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
রাজা শুদ্ধেদন পুত্রের মন ভোগ-সুখের প্রতি আকৃষ্ট করার মানসে তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইলেন। ষোড়শ বর্ষ বয়সে অশোকভা- বিতরণের মাধ্যেমে দ-পানি কন্যা গোপার সাথে কুমারের বিবাহ সম্পন্ন করেন। গোপার অন্য আরেক নাম ছিল যশোধরা। সন্তানের ভোগ বিলাসের জন্য রাজা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা তিন ঋতু উপযোগ তিনটি বিলাস বহুল প্রাসাদসহ বিবিধ ব্যবস্থা করলেন।
পিতার অনুমতিক্রমে একদিন নগর ভ্রমণে রেব হয়ে প্রথমে দেখলেন একবৃদ্ধ লোক,দ্বিতীয় বারে দেখলন রোগ যন্ত্রণার কাতর রোগী, তৃতীয় বারে দেখলেন এক মৃত ব্যক্তি চারজনে কাঁধে করে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানে, চতুর্থবার দেখলেন গৈরিক বসনধারী অপরূপ এক সন্ন্যাসী। এই প্রতিটি দৃশ্য সারথি ছন্দকের নিকট জানতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি ঊনত্রিশ বৎসর বয়সে রাতের আঁধারে অশ্ব কন্ঠককে নিয়ে গৃহ ত্যাগ করেন।
তিনি প্রথমে গিয়ে ভার্গবের আশ্রমে পৌঁছলেন। এরপর বহুল পরিচিত আরাড় কালামের আশ্রমে গমন করলেন। এরপর ঋষি আড়ার কালামের চেয়ে আরো জ্ঞানী রামপুত্র রুদ্রকের নিকট গমন করলেন। তিনি তাঁদের নিকট ধ্যান বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। তিনি আরো উচ্চতর জ্ঞান লাভ করার জন্য রামপুত্র রুদ্রকের আশ্রম ত্যাগ করে নৈরঞ্জনা নদীর তীরে উপনীত হন। ইতিমধ্যে ঋষি আড়ার কালামের তিনজন শিষ্য- কৌ-িণ্য,বপ্প ও অশ্বজিৎ এবং রামপুত্র রুদ্রকের দু’জন শিষ্য মহানাম ও ভদ্দিয় এসে তাঁর সাথে যোগ দিলেন।
একদিন তিনি সেনানি গ্রামে ভিক্ষান্নে বের হয়ে গ্রামের প্রবেশের মুখে আসতেই বিশ্রামের উদ্দেশ্যে একটি ন্যগ্রোধ বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট হয়ে ধ্যানমগ্ন হলেন। এদিকে ধনবান এক বনিক কন্যা সুজাতা বৃক্ষ দেবতাকে পূজা দেয়ার মানসে পায়সান্ন নিয়ে বৃক্ষের নিকট হাজির হলেন। সিদ্ধার্থ গৌতমের ধ্যান ভঙ্গ হলে সুজাতা পায়াসান্ন পাত্রটি সযতেœ তাঁর হাতে তুলে দিয়ে আর্শীবাদ গ্রহণ পূর্বক প্রস্থান করলেন। তিনি নৈরঞ্জনা নদীতে ¯œান সমাপন করে পায়াসান্ন ভোজন করলেন। পঞ্চবর্গীয় শিষ্যরা এ দৃশ্য অবলোকন করে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত চিত্ত ভেবে তাঁকে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেলেন।
সে দিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। সিদ্ধার্থ আহারের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলেন। এরপর নদীর পশ্চিম তীরে এক বিরাট অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে তৃণাসন পেতে পূর্বমূখী হয়ে বসে পড়লেন। তিনি সুমেরুর মত অটল, সুর্যের মত স্থির এবং বজ্রের মত কঠিন সব কিছুকে উপেক্ষা করে স্বীয় অভিষ্ট লক্ষ্যে বোধিজ্ঞান লাভের সাধনায় নিমগ্ন হয়ে দুষ্টমতি মারকে সসৈন্যে পরাজিত করে ৫৮৯ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ জগতে বুদ্ধ নামে অভিহিত হন। তিনি প্রথমে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের নিকট তাঁর নবলদ্ধ ধর্ম প্রচার করে তাঁর ধর্মে দীক্ষিত করেন। ক্রমে ক্রমে শ্রেষ্ঠী পুত্র যশ ও তাঁর বন্ধু ৫৪ জন প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হন। তখন পৃথিবীতে বুদ্ধসহ অর্হতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬১ জন। ক্রমে শাক্য পুত্রগণ বুদ্ধের ধর্মে উজ্জীবিত হয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এভাবে দীর্ঘ ৪৫ বৎসর তাঁর ধর্ম ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে প্রচার করেন।
বুদ্ধের নির্দেশে মাঘী পূর্ণিমায় আনন্দ বৈশালির চাপাল চৈত্য ভিক্ষুদের সমবেত করলেন। সেই ভিক্ষু সমাবেশে বুদ্ধ ঘোষণা করলেন, “ আমার পরিনির্বাণ লাভের শুভদিন ঘনিয়ে আসছে। আজ থেকে তিন মাস পর আমি পরিনির্বাণ লাভ করবো।” এ কথা শুনে আনন্দ কান্নায় ভেঙে পড়লে বুদ্ধ দৃঢ় কন্ঠে বললেন- “আনন্দ আমি তো বার বার বলেছি-প্রিয়বস্তু হতে বিচ্ছেদ ঘটবেই। যার জন্ম আছে তার অবশ্যই মৃত্যু আছে। এটাই জগতের চিরন্তন নিয়ম।” তিনি ভিক্ষুদের বললেন- “ ভিক্ষুগণ, আমি তোমাদেরকে যে সত্য ধর্ম শিক্ষা দিয়েছি তাকে সম্যকভাবে আয়ত্ত কর, তার সাধনা কর। তোমরা অবশ্যই সে ধর্মসমূহ জান। সে ধর্মসমূহ হল সংক্ষেপে ৩৭ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্ম। মানব জাতির সুখকর ও কল্যাণকর এ ধর্ম যাতে অনন্তকাল বিদ্যমান থাকে, সে উদ্দেশ্যে সমস্ত জীবের প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রী পোষণ করে এ ধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হও। হে ভিক্ষুগণ, মনকে সংযত করতে না পারলে নির্বাণ লাভ অসম্ভব। মনকে ভোগবিলাস থেকে দূরে রেখে প্রশান্ত করতে সচেষ্ট হও। পরিমিত পানাহার করে দেহের যাবতীয় প্রয়োজন মিটাবে। ভ্রমর যেমন পুষ্পের বর্ণ কিংবা গন্ধ নষ্ট না করে কেবল মধু আহরণ করে, তোমরাও তেমনি কারো ক্ষতি না করে জীবন নির্বাহ করবে।
হে ভিক্ষুগণ, ‘চারটি আর্যসত্য এত দিন আমরা বুঝতে পারিনি বলে জন্ম-জন্মান্তরে মিথ্যাপথে কতো বিচরণ করেছি। এখন সেই সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে- ‘চতুসচ্চং বিনিমুত্তং ধম্মং নাম নত্থি।’ এ চার আর্য সত্য ছাড়া অন্য কোন ধর্ম নেই। সেই চার আর্যসত্য হল- দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধ গামিনী প্রতিপদা। এখন সত্য পথে বিচরণ কর এবং শীলবান হও। পাপের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করতে থাক। আমি তোমাদেরকে যে ধ্যান শিক্ষা দিয়েছি, সেই সাধনা তোমরা অভ্যাস কর। তোমাদের মনশ্চক্ষু উন্মীলিত হোক। জ্ঞানের আলোকে হৃদয় আলোকিত হয়ে উঠুক। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অবলম্বন করে নির্বাণ লাভের সচেষ্ট হও।
অতঃপর তিনি সশিষ্য হিরণ্যবতী নদী পার হয়ে কুশী নগরের উপবনে মল্লদের শালবনে উপস্থিত হন। আনন্দ বুদ্ধের নির্দেশে দুই যমক শালতরুর মধ্যখানে উত্তর শীর্ষ করে বুদ্ধের শয্যা রচনা করলেন। বুদ্ধ সিংহ শষ্যায় শায়িত হয়ে রাত্রির শেষ যামে আশি বছর বয়সে ৫৪৪ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
এদিকে রাজা শুদ্ধোদন বয়ঃপ্রাপ্তির পর পরলোক গমন করেন। তখন উত্তরাধীকারী হিসেবে মহানাম শাক্য সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিছু সময় সুখে রাজ্যে বসবাস করার পর বিড়ুঢ়ভের আক্রমণে শাক্য বংশের পতনের কারণ হয় (৭ এপ্রিল ৬২৩ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ আর্বিভাব, ১০ এপ্রিল ৫৮৯ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ বুদ্ধত্ব লাভ, ২২ এপ্রিল ৫৪৪ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ মহাপরিনির্বাণ লাভ, ত্রিপিটক, সুর্দশন বড়ুয়া, ১৯৯৯ইং, পৃঃ ৩৫)।
বিড়ুঢ়ভের শাক্যবংশ আক্রমণের কারণঃ
শ্রাবস্তী নগরে অনাথপি-িকের গৃহে প্রতিনিয়ত পঞ্চশত ভিক্ষুর ভোজনের ব্যবস্থা ছিল। বিশাখা এবং কোশলরাজ গৃহেও এরূপ ভোজনের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু রাজার গৃহে নানারূপ উৎকৃষ্ট রসযুক্ত ভোজ্য প্রদত্ত হলেও পরিবেশনকারীরা ভিক্ষু সংঘকে প্রীতি চক্ষে দেখত না। সেখানে পি- গ্রহণ করে অনাথপি-িকের ও বিশাখার বা অন্য কোন শ্রদ্ধাবান উপাসকের গৃহে গিয়ে ভোজন করতেন। একদিন রাজার নিকট অনেক ভোজ্যোপহার এসেছিল। তিনি এগুলো ভিক্ষুদেরকে দেওয়ার জন্য ভোজন গৃহে প্রেরণ করলেন। ভৃত্যেরা এসে বলল, দেব ভোজনগৃহে কোন ভিক্ষু নেই। তাঁরা কোথায় গেলেন? তাঁরা স্ব-স্ব প্রিয় উপাসকের গৃহে ভোজন করতে গেছেন। এরপর রাজা প্রাতঃরাশ গ্রহণান্তে শাস্তার নিকট গিয়ে বললেন, ভদন্ত উৎকৃষ্ট ভোজন কাকে বলা হয়? তখন শাস্তা বললেন, প্রীতি সহকারে প্রদত্ত ভোজনই সর্Ÿোৎকৃষ্ট। লোকে যদি প্রীতির সাথে কাঞ্জিক দান করে তাও মধুর হয়। ভদন্ত কীদৃশ লোকের সাথে ভিক্ষুদের প্রীতি জন্ম হয়। স্ব-স্ব জ্ঞাতিগণের সাথে ও শাক্য কুলের সাথে। তখন রাজা ভাবলেন আমি একটি শাক্য কন্যা এনে তাঁকে অগ্র মহিষী করব। তা করলে ভিক্ষুরা আমাকে জ্ঞাতি সদৃশ মনে করে আমার প্রতি প্রীতিমান হবেন। অনন্তর তিনি উঠে গৃহে ফিরলেন এবং দূতমুখে কপিলাবস্তুতে সংবাদ পাঠালেন। আপনারা আমাকে একটি কন্যা দান করুন। আমি আপনাদের সঙ্গে বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ হতে ইচ্ছা পোষণ করি।
দূতদের কথা শুনে শাক্যগণ সমবেত হয়ে মন্ত্রণা করতে লাগলেন। তাঁরা বললেন, আমরা কোশলরাজ্যের আজ্ঞাধীন স্থানে বাস করি, যদি তাঁকে কন্যা দান না করি তাহলে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হবেন। কিন্তু দান করলেও আমাদের কুলাচার ভঙ্গ হবে। এ অবস্থায় কি করা কর্তব্য ? ইহা শুনে মহানাম নামক শাক্য উত্তর দিলেন, কোন চিন্তা নেই আমার কন্যা বাসভক্ষত্রিয়া নাগমু-া নামে দাসীর গর্ভে জন্মেছে। তাঁর বয়স এখন ষোল বৎসর। সে পরমসুন্দরী সুলক্ষণসম্পন্না এবং পিতৃধারায় ক্ষত্রিয়া। তাকে ক্ষত্রিয় কন্যা বলে রাজা প্রসেনজিতের নিকট প্রেরণ করব। ইহা উত্তম বলে সকলে সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং দূতদেরকে ডেকে বললেন- আমরা কন্যা দান করতেছি আপনারা এখনই তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করতে পারেন। দূতেরা ভাবলেন- এই শাক্যরা জ্ঞাতি সম্বদ্ধে অত্যন্ত অভিমানী। যে কারণে এঁদের কুলজাত নয়, এমন কন্যাকে হয়ত এঁরা আত্মকুলজা বলে দান করতে পারে অতএব এঁদের সঙ্গে একাসনে বসে আহার করে এমন কন্যা গ্রহণ করতে হবে। তাঁরা বললেন, বেশ গ্রহণ করতে যাচ্ছি, কিন্তু যিনি আপনাদের সাথে একাসনে আহার করেন, এমন কন্যা গ্রহণ করব। শাক্যগণ দূতদের বাসস্থানে নির্দিষ্ট করে দিলেন এবং কি করবেন, আবার তা মন্ত্রণা করতে লাগলেন।
মহানাম বললেন- তোমরা চিন্তা করিও না। আমি এর উপায় বের করে দিতেছি আমি যখন ভোজনে বসব, তখন তোমরা বাসভক্ষত্রিয়াকে অলঙ্কার পরিধান করে আমার নিকট নিয়ে আসবে এবং আমি একগ্রাস মুখে দিবার মাত্র একখানা পত্র দেখিয়ে বলবে, দেব-অমুক রাজা পত্র পাঠিয়েছেন তিনি কি বলতেছেন অনুগ্রহপূর্বক এখন তা শুনতে আজ্ঞা হয়। সকলে এ প্রস্তাব সম্মত হল। মহানাম যখন ভোজনে বসলেন, তখন তাঁরা কুমারীকে অলংঙ্কার পরিধান করল। মহানাম বললেন, আমার মেয়েকে নিয়ে আস, সে আমার সঙ্গে আহার করূক। তারা বলল তিনি অলঙ্কার পড়লেই আসবেন। অনন্তর একটু বিলম্ব করে তাঁরা কুমারীকে মহানামের নিকট নিয়ে আসলেন। তিনি খাবার খাবেন ভেবে সেই ভোজন পাত্রে হাত দিলেন। মহানাম তার সঙ্গে একগ্রাস মুখে দিলেন এবং যেসময় দ্বিতীয় গ্রাস গ্রহণের জন্য হস্ত প্রসারণ করলেন, অমনি কয়েক ব্যক্তি তাঁর সম্মুখে একখানা পত্র ধরে বলল, দেব অমুক রাজা পত্র পাঠিয়েছেন, তিনি কি বলেছেন শুনতে আজ্ঞা হোক। তখন মা তুমি খাও বলে মহানাম দক্ষিণ হস্তখানা পাত্রে রেখে বাম হস্তে পত্রখানি নিলেন এবং ইহা পড়তে লাগলেন। তাঁর ভোজন শেষ হলে মহানাম হস্ত ও মুখ প্রক্ষালন করলেন।
দূতেরা ভিতরের ব্যাপার জানতে পারল না। তাদের ধ্রব বিশ্বাস জন্মিল যে বাসভক্ষত্রিয়া মহানামের কন্যা। মহানাম কন্যাকে মহাসমারোহে প্রেরণ করলেন। দূতগণ তাঁকে শ্রাবস্তিতে নিয়ে রাজাকে বললেন, এই কুমারী সৎকুলজাত, ইনি মহানামের কন্যা। রাজা তুষ্ট হয়ে সমস্ত নগর সুসজ্জিত করালেন এবং বাসভক্ষত্রিয়াকে রতœরাশির মধ্যে বসিয়ে অগ্রমহিষীর পদে অভিষিক্ত করলেন। বাসভক্ষত্রিয়া রাজার প্রিয় ও চিত্ত চোষিণী হলেন। অচিরে তাঁর গর্ভসঞ্চার হল। গর্ভরক্ষার জন্য যে কার্য করা আবশ্যক রাজার আদেশে তা সমস্ত সম্পাদিত হল। বাসভক্ষত্রিয়া দশ মাস পরে এক সুম্পন্ন পুত্র প্রসব করলেন।এই কুমারের নামকরণ দিবসে রাজা কুমারের পিতামহীর নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞাসিলেন, শাক্য রাজ কন্যা বাসভক্ষত্রিয়া একটি পুত্র প্রসব করেছেন এর নাম কি রাখা হবে? যে অমাত্য এইকথা জানার জন্য গিয়েছিলেন, তিনি একটু বধির ছিলেন। রাজ পিতামহী তাঁর কথা শুনে বললেন, বাসভক্ষত্রিয়ার যখন পুত্র হয় তখনই তিনি সকলের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। এখন তিনি রাজার আরও “বল্লভা” হবেন। বধির অমাত্য “বল্লভা” শব্দটি ভালরুপে শুনতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন রাজ পিতামহী বুঝি বিড়–ঢ়ভ এই নাম উচ্চারণ করেছেন। অতএব তিনি রাজার নিকট গিয়ে বললেন মহারাজ কুমারের বিড়ুঢ়ভ নাম রাখুন। রাজা ভাবলেন এই বুঝি তার কুলদত্ত কোন প্রাচীন নাম, অতএব কুমারের নামরাখা হল বিড়ুঢ়ভ।
অতঃপর কুমারের পদোচিত আদর যতেœর সাথে লালিত পালিত হতে লাগলেন। তাঁর যখন বয়স সাত বছর তখন অন্য রাজপুত্র মাতামহকুল হতে কৃত্রিম হস্তী, অশ্ব ইত্যাদি উপহার স্বরূপ আসতে দেখে তিনি একদিন বাসভক্ষত্রিয়াকে জিজ্ঞাসা করলেন, মা অন্যের মাতালয় হতে কত উপহার এসে থাকে আমাকে তো কেউ কিছু পাঠায় না। তোমার কি বাপ মা নেই? বাসভক্ষত্রিয়া বললেন-বৎস তোমার মাতামহ বংশ শাক্যদের রাজা। তাঁরা দূরে থাকেন বিধায় কিছু পাঠাতে পারেন না। এরপর বিড়–ঢ়ভের বয়স যখন ষোল বৎসর হল, তখন তিনি একদিন তাঁর মাতাকে বললেন- আমার এক বার মাতালয় দেখতে ইচ্ছা হয়। বাসভক্ষত্রিয়া বললেন না বৎস সেখানে গিয়ে কি করবে? কিন্তু তিনি নিষেধ করলেও পুনঃপুনঃ এই প্রার্থনা করতে লাগলেন। তখন বাসভক্ষত্রিয়া অগত্যা সম্মতি দিলেন, বললেন- তবে যাও।
তখন বিড়ুঢ়ভ পিতার অনুমতি নিয়ে মহাসমোরহে যাত্রা করলেন। বাসভক্ষত্রিয়া মহানামকে অগ্রেই পত্র দ্বারা জানালেন, আমি এখানে বেশ সুখে আছি। আমার গুরুজন যেন একে গুপ্ত কথা না বলেন। বিড়ুঢ়ভের আগমণ সংবাদ পেয়ে শাক্যগণ অল্পবয়স্ক কুমারদের জনপদে পাঠিয়েদিলেন, কেননা শাক্য বংশীয় কেউ যেন তাঁকে প্রনাম করতে না হয়।
এদিকে বিড়ুঢ়ভ কপিলাবস্তুতে পৌঁছলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শাক্যগণ সংস্থাগারে সমবেত হলেন। সেখানে লোকে ইনি আপনার মাতুল, আই বলে সকলের সাথে তাঁর পরিচয় করে দিল। তিনি বিচরণ করে একে একে তাঁদের সকলকে প্রণাম করলেন। প্রণাম করতে করতে তাঁর পিষ্ঠে ব্যথা হল। কিন্তু কেউ তাঁকে প্রণাম করল না। এতে বিস্মিত হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আমাকে প্রণাম করতে পারে এমন কি কেউ নেই। শাক্যগণ বললেন- ‘বৎস যাঁরা তোমার কনিষ্ঠ তাঁরা জনপদে গেছে। অনন্তর তাঁরা অতি যতেœর সাথে বিড়ুঢ়ভের আহারাদির ব্যবস্থা করলেন।
বিড়ুঢ়ভ কপিলাবস্তুতে কয়েকদিন বাস করে নিষ্ক্রান্ত হলেন। অনন্তর এক দাসী, তিনি সংস্থাগারে যে ফলকাসনে বসেছিল, তা দুগ্ধ মিশ্রীত জলে ধৌত করতে গিয়ে রুঢ়ভাবে বলল, বাসভক্ষত্রিয়া দাসীর পুত্র এই আসনে বসেছিল। বিড়ুঢ়ভের এক অনুচর ভ্রমক্রমে একটি অস্ত্র ফেলে গিয়েছিল। সে এটি নিতে এসে দাসী বিড়–ঢ়ভের প্রতি অবজ্ঞাসূচক যে কথা বলেছিল, তা শুনতে পেল। সে জিজ্ঞাসা করে প্রকৃত রহস্য জানতে পারলÑ শুনল যে, বাসভক্ষত্রিয়া মহানামের ঔরসে এক দাসীর ঘরে জন্মে ছিল। সে গিয়ে সৈনিকদের একথা বলল। তখন বাসভক্ষত্রিয়া নাকি দাসী কন্যা, এই কথা নিয়ে মহাকোলাহল হল। তা শুনে কুমার প্রতিজ্ঞা করলেন এরা আমি যে আসনে বসে ছিলাম তা ক্ষীর দ্বারা ধৌত করুক। আমি রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এদের গলরক্তে আবার এই আসন ধৌত করব।
বিবিড়ুঢ়ভ শ্রাবস্তীতে ফিরলেন অমাত্যরা রাজাকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। তাঁকে দাসী কন্যা দিয়েছেন বলে রাজা শাক্যদের প্রতি ক্রোধী হলেন। তিনি বাসভক্ষত্রিয়া ও কুমারকে যে ধনাদি দান করতেন তা বন্ধ করলেন। দাস দাসীদেরকে লোকে যা দেয় কেবল তাই দেওয়া হত। এর কিছু দিন পরে শাস্তা রাজভবনে গিয়ে আসন গ্রহণ করলেন। রাজা তাঁকে প্রণাম করে বললেন- ভদন্ত আপনার জ্ঞাতিরা শুনলাম আমাকে দাসী কন্যা দান করেছেন। এ কারণে আমি বাসভক্ষত্রিয়া এবং তাঁর পুত্রকে যে বৃত্তি দিতাম, তা বন্ধ করেছি। দাস দাসীরা যা পাওয়ার উপযুক্ত কেবল তাই দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ইহা শুনে শাস্তা বললেন- মাহরাজ শাক্যরা অন্যায় কাজ করেছেন। কন্যা দান করতে হলে স্বজাতীয় কন্যা দান করা কর্তব্য। তবে এখানে একটা কথা বলার আছে। বাসভক্ষত্রিয়া ক্ষত্রিয়ের ঔরসজাতা এবং ক্ষত্রিয়ের গৃহে মহিষী পদে অভিষিক্তা বিড়ুঢ়ভও ক্ষত্রিয় রাজের ঔরসজাত পুত্র। মাতৃগোত্রের কি আসে যায়? পিতৃগোত্রেই অভিজাত্যের প্রমাণ, এটি ভেবে প্রাচীন পণ্ডিতেরা এক দরিদ্রা কাষ্ঠহারিণীকে মহিষী পদে বরণ করেছিলেন, এবং তাঁর গর্ভজাত পুত্র দ্বাদশ যোজন বিস্তৃত এই বারাণসী নগরেই রাজপদ লাভ করে কাষ্ঠবাহন রাজা নামে বিখ্যাাত হয়েছিলেন। এই বলে শাস্তা রাজাকে কাষ্ঠহারিণী জাতক শুনালেন। রাজা ধর্মকথা শুনে চিত্ত প্রাসাদ লাভ করলেন এবং পিতৃ গোত্রেই আভিজাত্যের প্রমাণ ইহা বুঝতে পেরে বাসভক্ষত্রিয়া ও তাঁর পুত্রের জন্য পূর্ববৎ বৃত্তি ব্যবস্থা করলেন।
অতঃপর রাজা প্রসেনজিৎ মৃত্যু বরণ করার পর কুমার বিড়ুঢ়ভ রাজ্য লাভ করে পূর্ব শত্রুতা স্মরণ পূর্বক শাক্যকুল নির্মুল করার অভিপ্রায়ে মহতী সেনাসহ কপিলাবস্তুর দিকে যাত্রা করলেন। ঐ দিন শাস্তা প্রত্যুষকালে ত্রিভূবন পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি দেখলেন যে তাঁর জ্ঞাতিকুল বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি স্থির করলেন যে জ্ঞাতিজনের প্রতিদয়া প্রদর্শন করা অবশ্য কর্তব্য। তিনি পূর্বাহ্ন ভিক্ষায় বের হলেন। ভিক্ষাচর্যান্তে গন্ধ কুটিরে গিয়ে সিংহশয্যায় শয়ন করলেন এবং সায়াহ্নে আকাশ পথে কপিলাবস্তুতে গিয়ে একটা স্বল্প ছায়া বৃক্ষমূলে উপবেশন করলেন। এর অনতিদূরে বিড়ুঢ়ভের রাজ্যের সীমায় একটা সান্দ্রছায়া প্রকা- ন্যগ্রোধ বৃক্ষ ছিল। বিড়ুঢ়ভ শাস্তাকে দেখে তাঁর নিকট গেলেন এবং প্রণিপাত পূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করলেন, ভদন্ত এই গরমের সময় কি কারণে স্বল্প ছায়া বৃক্ষ মূলে বসে আছেন। চলুন ঐ সান্দ্রছায়া বৃক্ষের মূলে বসুন গিয়ে। তখন শাস্তা বললেন- কোন প্রয়োজন নেই মহারাজ। “জ্ঞাতিজনের ছায়াই সর্বাপেক্ষা শীতল”। বিড়ুঢ়ভ ভাবলেন, শাস্তা জ্ঞাতিগণের রক্ষার্থে আগমণ করেছেন। তিনি শাস্তাকে প্রণাম করে শ্রাবস্তুীতে ফিরে গেলেন।
শাস্তাও আকাশ পথে জেতবনে প্রতিগমণ করলেন। কিন্তু বিড়ুঢ়ভ শাক্যদের অপরাধ ভুলতে পারলেন না। তিনি দ্বিতীয়বার অভিযানে বের হলেন ; কিন্তু সেবারও শাস্তাকে সেখানে দেখে রাজধানীতে ফিরে গেলেন। তাঁর তৃতীয় বারের চেষ্টাও বিফল হল। কিন্তু যখন তিনি চতুর্থ বার যুদ্ধ যাত্রা করলেন। তখন শাস্তা শাক্যদের পূর্Ÿকৃত কর্ম বিচার পূর্বক দেখলেন তাঁরা নদীতে বিষ প্রয়োগ করে যে পাপ সঞ্চার করেছেন, কিছুতেই তাঁর ফল এড়াতে পারবেন না। এজন্য তিনি চতুর্থ বারে কপিলাবস্তুতে গেলেন না।
রাজা বিড়ুঢ়ভ শাক্যদের প্রাণসংহার পূর্বক তাঁদের গলরক্তে সেই ফলকাসন ধৌত করলেন। অন্যরা যে দিকে পারে পলায়ন করে প্রাণরক্ষা করলেন। এভাবেই বিড়ুঢ়ভ তাঁর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেন। মহাকবি ক্ষেমেন্দ্রের অবদান কল্পলতা (১১শ ফল্লব) অনুসারে বিড়ুঢ়ভ সপ্ত সপ্ততি সহস্র শাক্যদের হত্যা করেছিলেন এবং অশীতি সহস্র যুবতীদের অপহরণ করেন কিন্তু যুবতীগণ অবাধ্য হওয়াতে বিড়ুঢ়ভ তাদের হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস বিড়ুঢ়ভ কপিলাবস্তু হতে প্রত্যাগমণ কালে অন্ধকার ঘনীভূত হওয়ায় মধ্য পথে অচিরাবতী নদীর মাঝখানে শুষ্ক বালুচরে বিশ্রামের আয়োজন করলেন। সেই দিন হঠাৎ মধ্যরাতে প্রবল বর্ষণ হওয়ায় সসৈন্যে বিড়ুঢ়ভ স্রোতের জলে ভেসে গেলেন। যারা একান্ত নিষ্পাপ তারা নদীর তট ভাগে বিশ্রাম করেছিলেন বলে প্রাণে রক্ষা পেলেন।
চাকমা ভাষা গবেষণা ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন ১, বিজয়গিরি চাকমা বলেছেন যে, ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কোশলরাজ প্রসেনজিতের পুত্র বিড়ুঢ়ভের আক্রমণে শাক্যজাতির উপর চলে আছে বিভীষিকারময় অমানুষিক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ। গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় ৫০৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এ নিধনযজ্ঞ চালানো হয়। এ সময় শাক্যজাতির বিরাট একটি অংশ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় আরেকটি অংশ কপিলাবস্তু রাজ্য থেকে পালিয়ে উত্তরে তিব্বত পূর্বে প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ (আসাম) হয়ে পূর্বে শ্যাম (থাইল্যান্ড), জাভা, বালি ও সুমাত্রার মত প্রত্যন্ত দ্বীপ অঞ্চলে চলে যায়।
বলা বাহুল্য বিড়ুঢ়ভের আক্রমণ স্থান ছিল শাক্যরাজ্য কপিলাবস্তু নগরী তাই মগধ ও কোশলরাজ্যের বসবাসকারী শাক্যরা এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হননি। তাঁরাই মূলতঃ বর্তমান চাকমা জাতির আদি পুরুষ বলা হয়েছে পরবর্তীতে আরাকান রাজ্য দখল করে ‘শাকম্যাং’ নাম ধারণ করে পরবর্তীতে ‘চাকমা’ শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে।
তথ্যসূত্র বই সমূহ:
১। যুগ বিবর্তনে চাকমা জাতি, শ্রী সি আর চাকমা, ১৯৮৭ইং, পৃঃ ১৯-২০।
২। গৌতম বুদ্ধ, জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া, ২০০৮ইং, পৃঃ ১৫-১৬, ১৮-১৯।
৩। চাকমা ভাষা গবেষণা ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন ১, বিজয়গিরি চাকমা ও দিনেশ রত্ন প্রভাকর সিদ্ধার্থ, ২০১৬ইং, পৃঃ ২১-২৩,১৩৩।
৪। চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯ইং, পৃ: ৬৮-৭০।
৫। ত্রিপিটক, সুর্দশন বড়ুয়া, ১৯৯৯ইং, পৃঃ ১-১১, ৩২- ৩৫।
৬। গৌতম বুদ্ধের জীবন ও ধর্ম, ২০১৩ইং, পৃঃ ২৭-৩৩, ৭১।
৭। অবদান কল্পলতা, মহাকবি, (১১শ ফল্লব)
৮। বুদ্ধের অভিযান, শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহথের,
৯। মহাশান্তি মহাপ্রেম, শীলানন্দ ব্রহ্মচারী, ২০০২ইং,
১০। ত্রিপিটক, সুর্দশন বড়ুয়া, ১৯৯৯ইং,
১১। মহাপরিনিব্বাণ, রাজগুরু শ্রী ধর্মরত্ন মহাস্থবির, ১৯৪১ইং
১২। বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, সম্পাদনায় অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার বড়ুয়া, পৃ: ১৩১।
১৩। গৌতম বুদ্ধের জীবন ও ধর্ম, ড. জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া, ২০১৩ইং, পৃ: ২৫-৪৪।
১৪। জাতক (১ম খ--৬ষ্ঠ খ-) ঈশানচন্দ্র ঘোষ

No comments