দীর্ঘ নিকায়ে ব্রহ্মজাল সূত্রে অপরান্ত কল্পিক মতবাদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধের প্রজ্ঞার আলোকে আলোকিত ‘দীর্ঘ নিকায়’-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূত্র হলো ‘ব্রহ্মজাল সূত্র’। এই সূত্রটি কেবল বৌদ্ধ ধর্মের নয়, বরং তৎকালীন ভারতবর্ষের সামগ্রিক দার্শনিক চিন্তার এক অনন্য দর্পণ। বুদ্ধের সমসাময়িক সমাজে প্রচলিত বিবিধ ধর্মমত, দার্শনিক চিন্তা এবং অন্ধবিশ্বাসকে বুদ্ধ তাঁর প্রজ্ঞার জালে একত্রীভূত করেছেন। বুদ্ধ এই সকল মতবাদকে ‘৬২ প্রকার মিথ্যা দৃষ্টি’ (Miccha Ditthi) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কেন এই মতবাদগুলো মিথ্যা? বুদ্ধের বিশ্লেষণে, যারা এই মতবাদগুলো পোষণ করেন, তারা ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির গোলকধাঁধায় বন্দি। ইন্দ্রিয়ের সাথে বিষয়ের স্পর্শ (Phassa) হলে মনে যে বেদনা (Vedana) অনুভূত হয়, সেই বেদনা থেকেই তৃষ্ণা (Tanha) এবং তৃষ্ণা থেকে আসক্তির (Upadana) জন্ম হয়। এই আসক্তিই মানুষকে জন্ম, জরা, ব্যাধি এবং মৃত্যুর চক্রে বা ‘ভব-চক্রে’ বন্দি করে রাখে। বুদ্ধ তাঁর কঠোর সাধনা ও বিদর্শন প্রজ্ঞার মাধ্যমে এই বেদনার উদয়-ব্যয় এবং এর অসারতা উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির ঊর্ধ্বে গিয়ে লাভ করেছিলেন ‘অসংখ্যাত নির্বাণ’। তাই তিনি এই ধর্মমতকে ‘অর্থজাল’, ‘ধর্মজাল’, ‘ব্রহ্মজাল’ এবং ‘অনুত্তর সংগ্রাম বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। এই ব্রহ্মজালের দুটি প্রধান ভাগ হলো— ‘পূর্বান্ত কল্পিক’ (অতীত নিয়ে জল্পনা) এবং ‘অপরান্ত কল্পিক’ (ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা)।
অপরান্ত কল্পিক: সংজ্ঞা ও দার্শনিক স্বরূপ:
‘অপরান্ত’ শব্দের অর্থ হলো ভবিষ্যৎ কাল বা চরম সীমা এবং ‘কল্পিক’ অর্থ হলো জল্পনাকারী বা যারা অনুমান নির্ভর চিন্তা করেন। সুতরাং, যারা মৃত্যুর পর আত্মার অবস্থা কী হবে বা ভবিষ্যতের জগত কেমন হবে—এই নিয়ে নানা কাল্পনিক তত্ত্ব ও দর্শন প্রচার করেন, তাঁদের বলা হয় ‘অপরান্ত কল্পিক’।
সহজ কথায়, মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা নিয়ে যে ৪৪ প্রকার দার্শনিক মতবাদ ব্রহ্মজাল সূত্রে আলোচিত হয়েছে, তাদের সমষ্টিই হলো অপরান্ত কল্পিক। এই মতবাদীদের মূল দুশ্চিন্তা হলো— “আমি কি ভবিষ্যতে থাকব? আমি কি ধ্বংস হয়ে যাব? নাকি আমার অবস্থা অন্য কিছু হবে?”
অপরান্ত কল্পিক মতবাদের শ্রেণীবিভাগ:
অপরান্ত কল্পিক মতবাদকে প্রধানত তিনটি বৃহৎ ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে। এই তিনটি ধারার অধীনেই ৪৪টি উপ-মতবাদ বিন্যস্ত। যথা:
১. উর্ধ্বমাঘতনিকবাদ (Survivalism)- ৩২টি মতবাদ।
২. উচ্ছেদবাদ (Annihilationism) - ৭টি মতবাদ।
৩. দৃষ্টধর্ম নির্বাণবাদ (Naturalistic Nirvana) - ৫টি মতবাদ।
নিচে এই মতবাদগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. উর্ধ্বমাঘতনিকবাদ (৩২টি মতবাদ):
মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব বজায় থাকে—এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ৩২টি মতবাদ গড়ে উঠেছে। একে তিনটি উপ-শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:
ক) সসংজ্ঞিবাদ (Conscious Survival - ১৬টি মতবাদ):
এই মতাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে, মৃত্যুর পর আত্মা সজ্ঞান বা সংজ্ঞাশীল অবস্থায় টিকে থাকে। আত্মার রূপ ও সীমা নিয়ে তাদের ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন ধারণা রয়েছে:
* আত্মা রূপী (Form) এবং সংজ্ঞাশীল।
* আত্মা অরূপী (Formless) এবং সংজ্ঞাশীল।
* আত্মা রূপী ও অরূপী উভয়ই।
* আত্মা রূপীও নয়, অরূপীও নয়।
* আত্মা সসীম (Finite), অসীম (Infinite), উভয়ই বা কোনটিই নয়।
এভাবে বিভিন্ন বিন্যাসের মাধ্যমে ১৬টি মতবাদ তৈরি হয়েছে।
খ) অসংজ্ঞিবাদ (Unconscious Survival - ৮টি মতবাদ):
কিছু দার্শনিক মনে করেন মৃত্যুর পর আত্মা বিদ্যমান থাকে ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনো চেতনা বা সংজ্ঞা থাকে না। অনেকটা গভীর সুষুপ্তি বা নিস্পন্দ অবস্থার মতো। তারা আত্মাকে রূপী, অরূপী, সসীম বা অসীম হিসেবে ৮ প্রকারে কল্পনা করেন।
গ) নৈবসংজ্ঞা-নাসংজ্ঞিবাদ (Neither Conscious nor Unconscious - ৮টি মতবাদ):
এই মতটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাদের মতে মৃত্যুর পর আত্মা এমন এক অবস্থায় থাকে যা সজ্ঞানও নয় আবার সংজ্ঞাহীনও নয়। এটি চেতনার এক রহস্যময় অবস্থা। এই ধারায়ও ৮টি মতবাদ বিদ্যমান।
আচার্য বুদ্ধঘোষের মতে, ‘উর্ধ্বমাঘতন’ শব্দের অর্থ হলো মরণোত্তর অবস্থা। এই ৩২টি মতবাদের অনুসারীরা আত্মার স্থায়িত্বে বিশ্বাসী বলে এদের ‘শাশ্বতবাদী’ বলা যেতে পারে, যারা ভবিষ্যতের কোনো এক কল্পিত জগতে আত্মার অমরত্ব কামনা করে।
২. উচ্ছেদবাদ (৭টি মতবাদ):
উচ্ছেদবাদীরা ‘শাশ্বতবাদে’র সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন। তাদের মূল কথা হলো— “মৃত্যুই সবকিছুর শেষ।” তাদের মতে, আত্মা বা সত্তার কোনো পরকাল নেই। এই দর্শনের ৭টি স্তর রয়েছে:
১. প্রথম উচ্ছেদবাদ: এই দেহ চার মহাভৌতিক উপাদান (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ) দিয়ে গঠিত এবং মাতা-পিতার মিলনে উৎপন্ন। দেহ বিনাশের সাথে সাথেই আত্মার বিনাশ ঘটে।
২. পরবর্তী ৬টি উচ্ছেদবাদ: তারা বিভিন্ন দিব্য লোক বা ধ্যানজ জগতের (কামাবচর, রূপাবচর এবং ৪টি অরূপাবচর স্তর) কথা স্বীকার করলেও মনে করেন যে, সেই স্তরের সত্তাও একসময় বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
উচ্ছেদবাদীরা মূলত কর্মফল ও পুনর্জন্ম অস্বীকার করে। বুদ্ধ এই মতবাদকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলেছেন, কারণ এটি মানুষকে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্যুত করে এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ করে তোলে।
৩. দৃষ্টধর্ম নির্বাণবাদ (৫টি মতবাদ):
এই মতবাদটি বর্তমান জীবনের পরম সুখের সাথে সম্পর্কিত। কিছু দার্শনিক মনে করেন যে, পরকালের কোনো কাল্পনিক নির্বাণের প্রয়োজন নেই; বরং বর্তমান জীবনেই সর্বোচ্চ শান্তি বা নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। এর ৫টি প্রকার হলো:
১. কামসুখই নির্বাণ: চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা ইত্যাদি পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে বিষয়ভোগ ও আনন্দ পাওয়া যায়, তাই হলো পরম নির্বাণ। (এটি আধুনিক ভোগবাদের আদি রূপ)।
২. প্রথম ধ্যানই নির্বাণ: কামসুখ অনিত্য ভেবে যারা ধ্যানের প্রথম স্তরে (বিতর্ক, বিচার, প্রীতি, সুখ) অবস্থান করেন এবং তাকেই নির্বাণ মনে করেন।
৩. দ্বিতীয় ধ্যানই নির্বাণ: বিতর্ক-বিচার শান্ত করে প্রীতি ও সুখের স্তরে থাকাকেই নির্বাণ ভাবা।
৪. তৃতীয় ধ্যানই নির্বাণ: প্রীতি ত্যাগ করে কেবল সুখে থাকাকেই মুক্তি ভাবা।
৫. চতুর্থ ধ্যানই নির্বাণ: সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল স্মৃতি ও উপেক্ষার শান্ত স্তরে অবস্থান করাকেই নির্বাণ মনে করা।
বুদ্ধ এই ৫টি মতবাদকে ভ্রান্ত বলেছেন কারণ ধ্যানের স্তরগুলোও ‘সংস্কৃত’ বা শর্তাধীন, যা নির্বাণের মতো ‘অসংস্কৃত’ বা শাশ্বত শান্তিময় নয়।
বুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি ও পরমত খণ্ডন:
তথাগত বুদ্ধ এই ৪৪ প্রকার অপরান্ত কল্পিক মতবাদকে খণ্ডন করেছেন অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে। বুদ্ধের মতে, শাশ্বতবাদীরা যেমন ‘অস্তিত্বের’ মোহে অন্ধ, উচ্ছেদবাদীরা তেমনি ‘নাস্তিত্বের’ মোহে আচ্ছন্ন। বুদ্ধ এই দুই চরম পন্থার (Extremes) মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘মধ্যম পন্থা’ বা ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’ (Dependent Origination) প্রচার করেছেন।
বুদ্ধের দর্শনে মূল যুক্তি:
বুদ্ধ বলেছেন, আত্মা বা জগত নিয়ে এই জল্পনাগুলো মূলত অবিদ্যা (Ignorance) থেকে উৎপন্ন। যখন কোনো ব্যক্তি তৃষ্ণার দ্বারা পরিচালিত হন, তখন তিনি হয় নিজেকে অমর করতে চান (ভব-তৃষ্ণা), না হয় নিজেকে ধ্বংস করতে চান (বিভব-তৃষ্ণা)। বুদ্ধের ভাষায়—
> *"বেদনা সমূহের উদয়, অস্তগমন, আস্বাদ, আদীনব (ত্রুটি) এবং মুক্তি সম্পর্কে যারা অবগত নন, তারাই এই মিথ্যা দৃষ্টির জালে আবদ্ধ হন।"*
বুদ্ধ শিখিয়েছেন যে, জীবন হলো একটি প্রদীপ শিখার মতো। এক শিখা থেকে অন্য শিখা জ্বলে ওঠে; এখানে যেমন সম্পূর্ণ একই আলো নেই, তেমনি সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোও নেই। জীবন হলো একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল ‘চিত্ত-সন্ততি’ বা প্রবাহ। যখন এই প্রবাহের কারণ (তৃষ্ণা) বিলুপ্ত হয়, তখনই প্রকৃত নির্বাণ লাভ হয়, যা কোনো জল্পনার বিষয় নয়, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয়।
অপরান্ত কল্পিক মতবাদের গুরুত্ব ও শিক্ষা:
ব্রহ্মজাল সূত্রে বর্ণিত এই ৪৪টি মতবাদ বিশ্লেষণ করলে আমরা মানুষের মনের গভীরতম ভয় ও আকাঙ্ক্ষার পরিচয় পাই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় বলেই পরকাল নিয়ে এত জল্পনা করে। কেউ অমরত্বের স্বপ্নে বিভোর হয়, কেউ আবার জীবনকে অর্থহীন মনে করে উচ্ছেদবাদী হয়।
বুদ্ধের এই বিশ্লেষণ আমাদের শেখায়:
১. যুক্তিবাদ: অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে কার্যকারণ সম্পর্ক দিয়ে জগতকে দেখা।
২. মোহমুক্তি: কাল্পনিক পরকাল বা বর্তমানের ভোগবিলাসের মোহে সত্যকে বিসর্জন না দেওয়া।
৩. প্রজ্ঞা: ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে পরম সত্যের সন্ধান করা।
পরিশেষে বলা যায় যে, অপরান্ত কল্পিক মতবাদসমূহ প্রাক-বৌদ্ধ ভারতের এক বৈচিত্র্যময় দার্শনিক পটভূমি তুলে ধরে। বুদ্ধ এই ৪৪টি মতবাদকে অর্থহীন জল্পনা হিসেবে বর্জন করেছেন কারণ এগুলো মানুষকে দুঃখ মুক্তির প্রকৃত পথ দেখাতে ব্যর্থ। বুদ্ধের ‘ব্রহ্মজাল’ হলো সেই প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা যা এই সমস্ত কুয়াশাচ্ছন্ন মতবাদকে ভেদ করে সত্যকে আলোকিত করে। বুদ্ধের অনুসারীদের জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি যে, আত্মা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃথা তর্কে লিপ্ত না হয়ে বর্তমান মুহূর্তের শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার চর্চাই হলো পরম মুক্তির পথ। বুদ্ধের এই ধর্মমত কেবল মতবাদ নয়, এটি একটি জীবন যাপনের বিজ্ঞান—যা মানুষকে জল্পনা-কল্পনার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে প্রকৃত শান্তির আস্বাদ দান করে। তাই বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষতলে তিনি যে বিজয় অর্জন করেছিলেন, তা ছিল এই সকল ভ্রান্ত দৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রজ্ঞার বিজয়। ব্রহ্মজাল সূত্র আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য কেবল অনুভবে নয়, সত্য নিহিত রয়েছে আসক্তিহীন পবিত্র বিমুক্তি বা নির্বাণের গভীর শান্তিতে।
লেখক পরিচিতি: ভদন্ত সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু (বি.এ (অনার্স), এম.এ, অধ্যক্ষ, হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, সীম্যান্স হোস্টেল, চট্টগ্রাম।

No comments