পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন প্রতিষ্ঠাতা ভদন্ত সুমনালংকার মহাথেরো জীবনি
পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড়, বন, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অঞ্চল নয়; এটি বহু প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনারও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা যুগে যুগে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র, অসহায়, অনাথ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে অনাথ শিশুদের আশ্রয়, শিক্ষা, নৈতিক গঠন ও ভবিষ্যৎ জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের উজ্জ্বল একটি দৃষ্টান্ত হলো পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন। ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়িতে ভদন্ত সুমনালংকার মহাথেরের উদ্যোগে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন বৌদ্ধ বিহার’কে কেন্দ্র করে এ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর উদ্দেশ্য ছিল কেবল ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা নয়; বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা।
ভদন্ত সুমনালংকার মহাথেরের জীবন ও সাধনা
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার কাচালং অববাহিকার লংগদু থানার তিনটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গৃহী নাম ছিল অসীম কুমার তালুকদার। পিতা ধীরেন্দ্র লাল তালুকদার এবং মাতা শশী প্রভা দেওয়ান। শৈশব ও কৈশোর অতিক্রম করে তিনি শিক্ষাজীবনে অগ্রসর হন এবং রাউজান কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করেন। ধর্মের প্রতি গভীর আকর্ষণ ও আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি আগ্রহ তাঁকে প্রব্রজ্যা জীবনের দিকে নিয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে তিনি তিনটিলা লংগুদু বন বিহারে সাধক পুরুষ বনভান্তের কাছে সাত দিনের জন্য প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হন। তখন তাঁর নাম হয় শ্রীমান সত্যলংকার শ্রামণ।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বার্মা বা বর্তমান মিয়ানমারে যাওয়ার ইচ্ছা তিনি গুরুদেবকে জানান। প্রথমদিকে অনুমতি পেলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে তাঁর বিদেশযাত্রা সম্ভব হয়নি এবং তিনি প্রব্রজ্যা জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ১৯৭৫ সালে পার্শ্ববর্তী রাজবিহারের অধ্যক্ষ রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের নিকট পুনরায় প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা গ্রহণ করেন। একই বছরে গুরুদেবের অনুমতিক্রমে তিনি বৌদ্ধ প্রধান দেশ বার্মায় গমন করেন। মিয়ানমারে অবস্থানকালে তিনি বৌদ্ধধর্ম ও বিনয় সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফিরে ১৯৮০ সালে পানছড়ির ‘লোগাং সমবায় মৈত্রী বিহার’-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিন বর্ষা যাপন করার পর ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে একটি বৃহৎ সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করেন। সেই সংকল্পের বাস্তব রূপই হলো পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন।
অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠার মানবিক উদ্যোগ
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা। ১৯৮৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতৃ-পিতৃহীন ও অসহায় ষোলজন শিশুকে সংগ্রহ করে অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এসব শিশুর জন্য শুধু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি; তাদের শিক্ষা, খাদ্য, পোশাক, নৈতিক শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন অনাথ শিশুর জীবনে একটি নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষার সুযোগ এবং ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যটি উপলব্ধি করেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে অনাথ আশ্রমটি ধীরে ধীরে একটি মানবিক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। বৌদ্ধধর্মের মেত্তা, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা—এই চার ব্রহ্মবিহারের আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে এমন উদ্যোগকে দেখা যায়। বুদ্ধের শিক্ষায় দুঃখী ও অসহায় মানুষের প্রতি করুণা প্রদর্শন একটি মহৎ মানবিক গুণ। তাই অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো নিছক সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি করুণাময় বৌদ্ধ জীবনাদর্শেরও বহিঃপ্রকাশ।
শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থানে পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন
ভদন্ত সুমনালংকার মহাথেরের স্বপ্ন শুধু অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি সমাজের প্রকৃত উন্নতি ঘটাতে হলে শিক্ষার বিস্তার এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন পালি কলেজ
২. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন অনাথালয়—১৯৮৩
৩. ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
৪. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়—১৯৯৫
৫. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন মেডিকেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (MATS)—২০১৩
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়টি এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং প্রায় ৩৫০ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ। ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল আত্মকর্মসংস্থানের একটি বাস্তব পথ। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করে তোলাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মূল তাৎপর্য। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা MATS-ও স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় ভবিষ্যতে অবদান রাখার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল বহুমুখী। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু, যুবক ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন—এসব ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।একটি সমাজের উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন মানুষ নিজেই নিজের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে। তাই শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও নৈতিক উন্নয়নকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের কার্যক্রমকে কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটিকে একটি সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
অন্যান্য বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম ও শিশুসদন
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু ও মহাথের অনাথ ও অসহায় শিশুদের জন্য আশ্রম ও শিশুসদন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠান পাহাড়ি সমাজে শিক্ষা বিস্তার ও মানবিক সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৯১ সালে পেরাছড়ায় ভদন্ত জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির ও শাসনপ্রিয় মহাস্থবিরের উদ্যোগে গিরিফুল শিশু সদন নামে একটি অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ভদন্ত মুক্তিপদ স্থবির এটি পরিচালনা করছেন বলে জানা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—বৌদ্ধ শিশুঘর, পুরনজয় শিশুসদন, প্রণয় শিশু সদন, বোধিগিরি শিশুসদন, সাতকমল পাড়া পঞ্চবুদ্ধ অনাথালয়, রোয়াংছড়ি অগ্রবংশ শিশুসদন, নাক্ষ্যংছড়ি চেতনা শিশু সদন, গাগড়া চন্দ্রবংশ শিশু সদন, ফারুয়া বৌদ্ধ শিশুসদন, বিলাইছড়ি রাজগুরু অগ্রবংশ শিশুসদন, বাঙ্গালহালিয়া শিশু সদন, শিজক অভয়তিষ্য শিশুসদন এবং লক্ষ্মীছড়ি পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন। এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ও কার্যক্রমের পরিধি একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ভিক্ষুসমাজ শুধু ধর্মীয় অনুশাসন প্রচারের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁরা সমাজের অসহায় শিশুদের আশ্রয়, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন।
সংকট ও পুনর্জাগরণের প্রয়োজন
একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যত কঠিন, তাকে দীর্ঘদিন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা তার চেয়েও কঠিন। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক, আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট দেখা দিতে পারে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় সাফল্যের উচ্চশিখরে থাকা পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন বর্তমানে নানা কারণে অনেকটাই নিস্তেজ অবস্থায় রয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাময়িক দুরবস্থা তার আদর্শ ও ঐতিহাসিক অবদানকে মুছে দিতে পারে না। বরং প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের ভিক্ষু, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির পুনর্জাগরণ সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রশাসন, জবাবদিহিতা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সমাজের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানকে সমাজ ও মানবকল্যাণের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
পরলোকগমন
“অনিচ্চা বত সঙ্খারা, উপ্পাদবয়ধম্মিনো।” অর্থাৎ—“সকল সংস্কারই অনিত্য; উৎপন্ন সকল কিছুরই ক্ষয় ও বিলয় অনিবার্য।” বুদ্ধের এই চিরন্তন বাণীকে সত্য প্রমাণ করে পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজের এক শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পরম শ্রদ্ধেয় সুমনালংকার মহাথেরো গত রাতে আনুমানিক শেষ ভোর ৪:০০ ঘটিকায় পরলোকগমন করেছেন। তাঁর প্রয়াণে বৌদ্ধ সমাজে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ধর্মীয় শিক্ষা, বুদ্ধের শাসন প্রচার, মানবকল্যাণ এবং পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন তিনি বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ, শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার চর্চা এবং প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সুমনালংকার মহাথেরোর মহাপ্রয়াণে তাঁর শিষ্য, ভক্ত, অনুরাগী এবং শুভানুধ্যায়ীরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। “জীবন অনিত্য, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; কিন্তু মহৎ কর্ম ও আদর্শ মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী।” পরম শ্রদ্ধেয় মহাথেরোর প্রয়াণে তাঁর শোকসন্তপ্ত শিষ্য ও অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
“অনিচ্চা বত সঙ্খারা, উপ্পাদবয়ধম্মিনো।” অর্থাৎ—“সকল সংস্কারই অনিত্য; উৎপন্ন সকল কিছুরই ক্ষয় ও বিলয় অনিবার্য।” বুদ্ধের এই চিরন্তন বাণীকে সত্য প্রমাণ করে পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজের এক শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পরম শ্রদ্ধেয় সুমনালংকার মহাথেরো গত রাতে আনুমানিক শেষ ভোর ৪:০০ ঘটিকায় পরলোকগমন করেছেন। তাঁর প্রয়াণে বৌদ্ধ সমাজে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ধর্মীয় শিক্ষা, বুদ্ধের শাসন প্রচার, মানবকল্যাণ এবং পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন তিনি বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ, শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার চর্চা এবং প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সুমনালংকার মহাথেরোর মহাপ্রয়াণে তাঁর শিষ্য, ভক্ত, অনুরাগী এবং শুভানুধ্যায়ীরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। “জীবন অনিত্য, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; কিন্তু মহৎ কর্ম ও আদর্শ মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী।” পরম শ্রদ্ধেয় মহাথেরোর প্রয়াণে তাঁর শোকসন্তপ্ত শিষ্য ও অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
উপসংহার:
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের ইতিহাস মূলত একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের স্বপ্ন, সাধনা, ত্যাগ ও সমাজসেবার ইতিহাস। ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের নিজের মেধা, শ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে শিক্ষা, অনাথসেবা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মানবকল্যাণের বহুমুখী কেন্দ্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৮৩ সালে মাত্র ষোলজন অনাথ শিশুকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে যে মানবিক উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তীতে পালি শিক্ষা, আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল শিক্ষার মতো বিস্তৃত কর্মকাণ্ডে রূপ নেয়। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য শিশুসদন ও অনাথ আশ্রম প্রমাণ করে যে ধর্মীয় জীবন ও সমাজসেবা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বুদ্ধের করুণার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অসহায় শিশুর মুখে হাসি ফোটানো, শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা নিঃসন্দেহে মহৎ পুণ্যকর্ম। তাই পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন ও এ ধরনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মানবিক, শিক্ষিত ও আত্মনির্ভর সমাজ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাস সংরক্ষণ, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে এগুলো আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মানবকল্যাণের যে প্রদীপ একদিন জ্বালানো হয়েছিল, তা যেন কোনোভাবেই নিভে না যায়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি: সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বিএ (অনার্স), এম.এ., এম.এড. প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, ইপিজেড, চট্টগ্রাম।
No comments