উদয়ন কে ছিলেন? তিনি কিভাবে রাজ্যে অভিষিক্ত হলেন? ঘটনা উল্লেখ করে বর্ণনা দাও
প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ সাহিত্যে রাজা উদয়নের কাহিনি এক বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় উপাখ্যান। তাঁর জন্ম, শৈশব, প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে নিজ বুদ্ধি, মেধা, সাহস ও বিচক্ষণতার দ্বারা পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার—সমগ্র ঘটনাপ্রবাহে যেমন নাটকীয়তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর নৈতিক ও জীবনদর্শনমূলক শিক্ষা। উদয়নের জীবন যেন প্রমাণ করে—“বিপদ মানুষের পথ রুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু মেধা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পথ কখনো রুদ্ধ করতে পারে না।” প্রতিকূলতার মধ্যেও যে ব্যক্তি নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে পারে, সাফল্য একদিন তার দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়।
উদয়নের জন্মকথা
তৎকালে কৌশাম্বী নগরে পরন্তপ নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। একদিন রাজা তাঁর গর্ভবতী মহিষীকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের তাপ উপভোগ করার জন্য একটি নির্জন অবকাশস্থানে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় মহিষীর পরনে ছিল রাজমহলের অতি মূল্যবান রক্তবর্ণ কম্বল। কথোপকথনের একপর্যায়ে মহিষী রাজার আঙুল থেকে অঙ্গুরী নিয়ে নিজের হাতে পরিধান করেন। এদিকে আকাশপথে এক হস্তিলিঙ্গ পক্ষী উড়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে রক্তবর্ণ কম্বলে আবৃত মহিষীকে দেখে পক্ষীটি তাঁকে মাংসখণ্ড মনে করে। অতঃপর নখপঞ্চর দ্বারা তাঁকে তুলে আকাশে উড়ে যায়। কথিত আছে, সেই পক্ষীদের প্রত্যেকটির পাঁচটি হাতির সমান বল ছিল। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পক্ষীটি হিমবন্ত প্রদেশের একটি প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের কাছে পৌঁছে মহিষীকে বৃক্ষের কোঠরে রেখে দেয়। পক্ষীটির স্বভাব ছিল—কোনো কিছু রেখে দেওয়ার পর পুনরায় ফিরে এসে তা দেখে নেওয়া। ফলে মহিষী বুঝতে পারলেন, পক্ষীটি আবার ফিরে আসবে। তখন আত্মরক্ষার জন্য তিনি দুই হাত উঁচু করে হাত ও মুখ দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে পক্ষীটিকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন।
এরপর সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময় মহিষীর প্রসববেদনা শুরু হয়। অরণ্যের নির্জনতা, অজানা পরিবেশ ও গভীর রাত—সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত করুণ হয়ে ওঠে। সারারাত তিনি দুঃখ ও যন্ত্রণায় নিদ্রাহীন অবস্থায় কাটান। অবশেষে রাতের অবসান ঘটে। আকাশ থেকে মেঘ সরে যায়, সূর্যোদয় হয় এবং একই সঙ্গে মহিষীর পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। মহিষী মনে করলেন, মেঘের শীতলতা, পর্বতের শীতলতা এবং সূর্যোদয়ের সময়ের কোমল আবহের মধ্যে তাঁর পুত্রের জন্ম হয়েছে। সেই স্মৃতিকে ধারণ করে পুত্রের নাম রাখলেন **“উদয়ন”**। এভাবেই অতি বিচিত্র ও অলৌকিক পরিবেশে উদয়নের জন্ম হয়। “প্রতিকূলতার অন্ধকারের মধ্যেই অনেক সময় সম্ভাবনার সূর্যোদয় ঘটে।” উদয়নের জন্মকাহিনি যেন এই সত্যেরই প্রতীক।
অরণ্যে উদয়নের শৈশব
হস্তিলিঙ্গ পক্ষীর দ্বারা মহিষীর অপহরণের পর তাঁর আর কৌশাম্বীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী উদয়ন রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে অরণ্যের পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকেন। সেই সময় অল্লকপ্প ও বেঠদ্বীপের দুই রাজা শৈশবকাল থেকেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু রাজজীবনের অনিত্যতা উপলব্ধি করে তাঁরা জন্ম, জরা ও মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। হিমালয়ের পাদদেশে তাঁরা পৃথক দুটি পর্বতে বসবাস করতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল—উপোসথ দিবসে তাঁরা আগুন জ্বালিয়ে একে অপরকে নিজেদের অবস্থানের সংকেত দেবেন। পরবর্তীকালে বেঠদ্বীপ তাপস মৃত্যুবরণ করে মহাশক্তিশালী দেবরাজ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। পূর্বজীবনের কথা স্মরণ করে একদিন তিনি তাঁর পুরোনো বন্ধুকে দেখতে এলেন। বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময়ের পর তিনি জানতে পারলেন, অল্লকপ্প তাপস হস্তীর উপদ্রবে কষ্ট পাচ্ছেন। তখন দেবরাজ তাঁকে **হস্তিবীণা ও হস্তিকান্ত মন্ত্র** শিক্ষা দিয়ে স্বর্গলোকে ফিরে গেলেন। অল্লকপ্প তাপস সেই মন্ত্রের সাহায্যে হস্তীর উপদ্রব থেকে মুক্ত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে লাগলেন।
তাপসের হাতে উদয়নের লালন-পালন
যে বটবৃক্ষের কোঠরে হস্তিলিঙ্গ পক্ষী মহিষীকে রেখে গিয়েছিল, সেই বৃক্ষটি ছিল অল্লকপ্প তাপসের আশ্রমের কাছাকাছি। একদিন বৃষ্টির সময়ে তাপস ফলমূল সংগ্রহ করতে বেরিয়ে সেই বটবৃক্ষের নিচে এলেন। সেখানে তিনি সাধারণত শকুনের খাদিত মাংসের অস্থি সংগ্রহ করে তা থেকে রস তৈরি করে পান করতেন। সেদিনও অস্থি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বৃক্ষের নিচে গিয়ে তিনি হঠাৎ শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। বিস্মিত হয়ে চারদিকে তাকিয়ে তিনি বৃক্ষের কোঠরে মহিষী ও শিশুকে দেখতে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ঘটনাটি সাধারণ নয়। অল্লকপ্প তাপস মহিষী ও শিশুটিকে বৃক্ষ থেকে নামিয়ে নিজের আশ্রমে নিয়ে এলেন এবং তাঁদের আশ্রয় দিলেন। তাপস শীলভঙ্গ না করে শিশুটির লালন-পালনের ব্যবস্থা করলেন। এভাবেই রাজবংশে জন্ম নেওয়া উদয়ন অরণ্যের এক তাপসের আশ্রমে বড় হতে থাকলেন। তবে কিছুদিন পর মহিষীর মনে ভয় জন্ম নিল। তিনি ভাবলেন—এই অরণ্যে তাঁদের যাতায়াতের কোনো পথ তাঁর জানা নেই। তাপস যদি কোনোদিন তাঁদের ছেড়ে চলে যান, তাহলে মা ও পুত্র দুজনের জীবনই বিপন্ন হবে। এই আশঙ্কা থেকে তিনি তাপসের সঙ্গে সংসারজীবনে আবদ্ধ হন। এভাবেই উদয়ন অরণ্যের পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর মধ্যে রাজকীয় রক্তের পরিচয় ও সম্ভাবনা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।
পিতৃরাজ্যের সংবাদ
একদিন অল্লকপ্প তাপস নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে জানতে পারলেন যে কৌশাম্বীর রাজা পরন্তপ মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সংবাদ শুনে মহিষী গভীর শোকে কাঁদতে লাগলেন। তাপস তাঁর কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন—তাঁর পুত্র যদি কৌশাম্বীতে থাকত, তবে সে পিতৃবংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজ্য লাভ করতে পারত। তখন তাপস তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন যে উদয়নের রাজ্য লাভের ব্যবস্থা তিনি করবেন। এই পর্যায়টি উদয়নের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতদিন যে বালক অরণ্যের নির্জনতায় বেড়ে উঠছিল, সে জানতে পারল—সে কোনো সাধারণ ব্যক্তি নয়; সে কৌশাম্বীর প্রয়াত রাজা পরন্তপের পুত্র এবং পিতৃরাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।
মেধা ও বুদ্ধির পরিচয়
অল্লকপ্প তাপস উদয়নকে হস্তিবীণা ও হস্তিকান্ত মন্ত্র শিক্ষা দিলেন। উদয়ন অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই বিদ্যা আয়ত্ত করলেন। মাতার কাছ থেকে পিতার রাজ্য ও নিজের রাজবংশের পরিচয় জানার পর তিনি পিতৃরাজ্য উদ্ধারের সংকল্প গ্রহণ করলেন। এরপর মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও বন্দনা জানিয়ে উদয়ন বীণা-মন্ত্রের সাহায্যে একটি জ্যেষ্ঠ হস্তীকে আহ্বান করলেন। হস্তীর পিঠে আরোহণ করে তিনি কৌশাম্বীর দিকে যাত্রা করলেন। তাঁর হাতে ছিল বিদ্যার শক্তি, মনে ছিল আত্মবিশ্বাস এবং সামনে ছিল পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য। পথে তিনি সেই বৃদ্ধ হস্তীকে নির্দেশ দিলেন—অনেক সহস্র হস্তী যেন তাঁর সঙ্গে আসে। তাঁর নির্দেশে অসংখ্য হস্তী এসে সমবেত হলো। পরে তিনি আবার বললেন—বৃদ্ধ হস্তীগুলো ফিরে যাক এবং অতি তরুণ ও বলিষ্ঠ হস্তীগুলো তাঁর সঙ্গে থাকুক। তাঁর মন্ত্রের প্রভাবে তেমনই ঘটল। এখানেই উদয়নের অসাধারণ প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি শুধু শক্তির ওপর নির্ভর করেননি; বরং শক্তিকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের কৌশলও জানতেন। “শক্তি যখন বুদ্ধির অধীন হয়, তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।”
পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার
সহস্র বলিষ্ঠ হস্তী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে উদয়ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোকবল সংগ্রহ করলেন। এরপর তিনি কৌশাম্বীর রাজদরবারে সংবাদ পাঠালেন—হয় যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁকে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নয়তো তাঁর পিতৃরাজ্য তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হবে। রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হলো—রাজা পরন্তপের মহিষী গর্ভবতী অবস্থায় হস্তিলিঙ্গ পক্ষীর দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন। তাঁর কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর কোনো পুত্র জীবিত আছে—এ কথা সহজে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। রাজ্যও তাঁকে দেওয়া হবে না। উদয়ন তখন নিজেকে পরন্তপ রাজার পুত্র বলে পরিচয় দিলেন। কিন্তু শুধু কথায় কেউ বিশ্বাস করল না। তখন তিনি তাঁর মাতার কাছে থাকা **রক্তবর্ণ মূল্যবান কম্বল ও রাজার অঙ্গুরী** পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শন করলেন। এই দুটি নিদর্শন দেখে নগরবাসী ও রাজপরিষদ নিশ্চিত হলো যে তিনি সত্যিই পরন্তপ রাজার পুত্র। অবশেষে সকল সন্দেহের অবসান হলো। রাজবংশের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে উদয়নকে কৌশাম্বীর রাজ্যে অভিষিক্ত করা হলো। এভাবেই অরণ্যে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক রাজপুত্র নিজের মেধা, সাহস, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধির মাধ্যমে পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করে রাজাসনে অধিষ্ঠিত হলেন।
উদয়নের জীবনকাহিনি কেবল একজন রাজপুত্রের রাজ্যলাভের কাহিনি নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়লাভের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জন্মের পর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল বিপর্যয়। রাজপ্রাসাদের উত্তরাধিকারী হয়েও তাঁকে অরণ্যের অনিশ্চিত পরিবেশে বেড়ে উঠতে হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ তাঁর সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করতে পারেনি। অল্লকপ্প তাপসের আশ্রয়ে তিনি শিক্ষা লাভ করেন, মেধা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটান এবং উপযুক্ত সময়ে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বুঝেছিলেন—শুধু বংশপরিচয় রাজ্য উদ্ধারের জন্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞান, কৌশল, সাহস ও নেতৃত্বের সমন্বয়। তাই হস্তিবিদ্যা ও মন্ত্রজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলেন এবং প্রমাণসহ নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। উদয়নের কাহিনি আমাদের শিক্ষা দেয়— “বুদ্ধিমত্তাই সাফল্যের চাবিকাঠি।”
জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই; কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ না করে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। উদয়ন তাঁর জীবনের ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তন সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই তাঁর কাহিনি শুধু ইতিহাস বা বৌদ্ধ সাহিত্যের একটি উপাখ্যান নয়—এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায়, প্রজ্ঞা ও সাফল্যের এক অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষা।
লেখক পরিচিতি: সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বিএ (অনার্স), এম.এ., এম.এড. প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিল চাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, ইপিজেড, চট্টগ্রাম।

No comments