সূত্রপিটকে খুদ্ধকনিকায়ে জাতক গ্রন্থে শিবি জাতকের মূল বিষয়বস্তু আলোচনা
জাতক কাহিনিসমূহ বৌদ্ধ সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এসব কাহিনির মাধ্যমে ভগবান বুদ্ধ তাঁর পূর্বজন্মের নানা ঘটনা বর্ণনা করে মানবজীবনের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও মহৎ আদর্শের শিক্ষা দিয়েছেন। জাতকগুলোর মধ্যে শিবি জাতক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আত্মত্যাগ, দানশীলতা, সত্যনিষ্ঠা, পরোপকার এবং পরম করুণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই জাতক। নিজের জীবন, দেহ ও প্রিয়তম অঙ্গ পর্যন্ত পরের কল্যাণে উৎসর্গ করার যে বিরল মানসিক শক্তি বোধিসত্ত্বের মধ্যে ছিল, শিবি জাতকের কাহিনিতে তারই অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে। ভগবান বুদ্ধ জেতবনে অবস্থানকালে একদিন রাজা প্রসেনজিতের একটি দানের প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে এই জাতক দেশনা করেছিলেন। রাজা প্রসেনজিৎ বুদ্ধকে অসদৃশ বা অত্যন্ত মূল্যবান দান প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বুদ্ধ তা অনুমোদন না করে বিহারে চলে আসেন। পরদিন রাজা বুদ্ধের কাছে এসে জানতে চাইলে বুদ্ধ তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যে, অশুদ্ধ চিত্ত ও কৃপণ মন নিয়ে দান করলে তার প্রকৃত কল্যাণকর ফল লাভ করা যায় না। বুদ্ধের এই ধর্মদেশনায় রাজা প্রসন্ন হয়ে শতসহস্র মুদ্রামূল্যের শিবিদেশজাত উত্তরাসঙ্গ দান করেন। পরে ভিক্ষু সংঘের মধ্যে রাজার সেই দান নিয়ে আলোচনা হলে ভগবান বুদ্ধ শিবি জাতকের কাহিনি বর্ণনা করেন।
শিবি রাজার দানশীলতা
অতীতকালে অরিষ্ঠপুর নগরে মহারাজ শিবি রাজত্ব করতেন। বোধিসত্ত্ব সেই সময় তাঁরই পুত্র হিসেবে শিবি কুমার নামে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল অতিক্রম করে তিনি যথাযথভাবে বিদ্যা ও বিভিন্ন শাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন এবং প্রজাদের প্রতি ন্যায়, সাম্য ও ধর্মনীতি প্রতিষ্ঠা করে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। শিবি রাজা ছিলেন অসাধারণ দানশীল। তিনি নগরের চার দ্বারে, নগরের অভ্যন্তরে এবং রাজপ্রাসাদের দ্বারে—এই ছয় স্থানে ছয়টি দানশালা নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিদিন তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করতেন। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার মতো পুণ্যতিথিতে তিনি নিজে দানশালায় উপস্থিত হয়ে দানকার্য তদারক করতেন। তাঁর দানের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। দরিদ্র, অসহায়, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য তাঁর রাজদ্বার সর্বদা উন্মুক্ত ছিল। এক পূর্ণিমার দিনে রাজা প্রাসাদে বসে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন—জীবনে এমন কোনো বাহ্যিক বস্তু নেই, যা তিনি দান করেননি। কিন্তু কেবল ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক বস্তু দান করলেই তাঁর হৃদয় তৃপ্ত হচ্ছে না। তাঁর দানের আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর ও ব্যাপক। তিনি সংকল্প করলেন, আজ যদি কোনো প্রার্থী এসে বাহ্যিক কোনো বস্তু না চেয়ে তাঁর শরীরের কোনো অঙ্গ, এমনকি হৃদয়, রক্ত অথবা চোখ পর্যন্ত প্রার্থনা করে, তবে তিনি তা-ও দ্বিধাহীন চিত্তে দান করবেন। এই মহৎ সংকল্প গ্রহণ করে রাজা স্নান করলেন, রাজকীয় অলংকারে নিজেকে সজ্জিত করলেন, উৎকৃষ্ট আহার গ্রহণ করলেন এবং দানশালায় উপস্থিত হলেন। তাঁর অন্তর তখন পরম দানের আনন্দে পূর্ণ।
দেবরাজ ইন্দ্রের পরীক্ষা
রাজা শিবির এই বিরল দানসংকল্প দেবরাজ ইন্দ্রের দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, বোধিসত্ত্বের দানপরমিতা কতদূর বিকশিত হয়েছে তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই দেবরাজ ইন্দ্র অন্ধ ও জরাগ্রস্ত এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে শিবি রাজার দানশালায় উপস্থিত হলেন। ব্রাহ্মণ রাজাকে প্রশংসা করে তাঁর কাছে দান প্রার্থনা করলেন। রাজা আনন্দিত হয়ে বললেন, তিনি কী চান। তখন ব্রাহ্মণ রাজ্যের ধনসম্পদ, স্বর্ণ, রত্ন কিংবা অন্য কোনো বস্তু না চেয়ে রাজার দুটি চোখ প্রার্থনা করলেন। এই কথা শুনে উপস্থিত সকলে বিস্মিত হয়ে গেল। কিন্তু রাজা শিবির মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা দেখা দিল না। বরং তিনি আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে, অবশেষে এমন একজন প্রার্থী এসেছেন, যিনি তাঁর কাছে এমন কিছু চেয়েছেন যা সত্যিই মূল্যবান এবং যা দান করা অত্যন্ত কঠিন।রাজা ব্রাহ্মণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন এবং সীবক নামের রাজবৈদ্যকে ডেকে বললেন—তাঁর একটি চোখ যেন ব্রাহ্মণের জন্য বের করে দেওয়া হয়।
চোখ দানের কঠিন পরীক্ষা
রাজার চোখ দান করার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র নগরে ছড়িয়ে পড়ল। নগরবাসী, মন্ত্রী, সেনাপতি, রাজপরিবার ও অন্তঃপুরের সদস্যরা শোক ও উদ্বেগে রাজপ্রাসাদে ছুটে এলেন। সকলে রাজার কাছে এই ভয়াবহ দান থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু রাজা তাঁর সংকল্পে অটল রইলেন। সীবক বৈদ্যও রাজাকে অনুরোধ করে বললেন—চক্ষুদান অত্যন্ত কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক। মহারাজ যেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। রাজা শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, তিনি সবকিছু চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; অতএব আর বিলম্ব করা উচিত নয়। সীবক তখন একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে রাজার দেহে সরাসরি অস্ত্র প্রয়োগ করতে সংকোচ বোধ করলেন। তাই তিনি নানা ঔষধি গুঁড়া একটি নীলপদ্মের ওপর ছড়িয়ে সেই পদ্ম রাজার ডান চোখে স্পর্শ করাতে লাগলেন। ঔষধের প্রভাবে চোখের গোলক ধীরে ধীরে ঘুরে উঠল এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণা সৃষ্টি হলো। সীবক আবারও বললেন—“মহারাজ, এখনও প্রতিকার সম্ভব। আপনি চাইলে আমি এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারি।” কিন্তু শিবি রাজা বললেন—“ভাই সীবক, আর বিলম্ব করো না।” সীবক দ্বিতীয়বার ঔষধ প্রয়োগ করলেন। এবার চোখের গোলক কোটর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। ব্যথা আরও তীব্র হয়ে উঠল। রাজা প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করেও তাঁর সংকল্প থেকে বিচ্যুত হলেন না। তৃতীয়বার সীবক আরও তীক্ষ্ণ ঔষধ প্রয়োগ করলেন। এবার চোখটি কোটর থেকে বেরিয়ে এসে একটি মাত্র স্নায়ুসূত্রে ঝুলতে লাগল। চারদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। আমাত্য, রাজপরিবার ও অন্তঃপুরের নারীরা রাজার পায়ে পড়ে তাঁকে দান থেকে বিরত থাকার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন। কিন্তু রাজা শিবির মন ছিল পর্বতের মতো অটল। অবশেষে সীবক বাম হাতে রাজার চোখ ধারণ করে ডান হাতে অস্ত্র তুলে নিলেন এবং স্নায়ুসূত্র ছেদন করে চোখটি রাজার হাতে তুলে দিলেন। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় রাজার শরীর রক্তাক্ত হয়ে উঠল; রক্তে তাঁর বস্ত্র ভিজে গেল। তবুও তাঁর মুখে ছিল না অনুশোচনা, ছিল কেবল দানের আনন্দ।
সর্বজ্ঞতার চক্ষুর আকাঙ্ক্ষা
চোখটি হাতে নিয়ে রাজা ব্রাহ্মণকে বললেন—সর্বজ্ঞতার জ্ঞান লাভের জন্য যে চক্ষু প্রয়োজন, তাঁর কাছে সেই জ্ঞানচক্ষু এই শারীরিক চোখের চেয়েও শতগুণ, সহস্রগুণ অধিক প্রিয়। সেই মহৎ জ্ঞান লাভের আকাঙ্ক্ষায় তিনি তাঁর শারীরিক চোখ ব্রাহ্মণকে দান করছেন। ব্রাহ্মণ সেই চোখ গ্রহণ করে নিজের চোখের কোটরে স্থাপন করলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের দৈবশক্তির প্রভাবে তা নীলোৎপলের মতো দীপ্ত ও সুন্দর হয়ে উঠল। রাজা শিবি তাঁর অপর চোখটিও ব্রাহ্মণকে দান করলেন। ব্রাহ্মণ দ্বিতীয় চোখটিও গ্রহণ করে প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। চোখ দুটি দান করার পর শিবি রাজা অন্ধ হয়ে গেলেন। কয়েক দিন তিনি রাজপ্রাসাদে অবস্থান করলেন এবং পরে অমাত্যদের হাতে রাজ্যের দায়িত্ব অর্পণ করে একটি পুষ্করিণীর তীরে গিয়ে বসবাস করতে লাগলেন। সেখানে বসে তিনি নিজের দানের কথা স্মরণ করছিলেন।
সত্যক্রিয়ার মাহাত্ম্য
রাজা শিবির এই মহান আত্মত্যাগে দেবরাজ ইন্দ্রের আসন পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, বোধিসত্ত্বের দানপরমিতা সাধারণ মানুষের দানের মতো নয়; এটি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত।দেবরাজ ইন্দ্র শিবিরাজার কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সত্যক্রিয়া করতে বললেন। তখন রাজা বললেন—তিনি যে চক্ষু দান করেছেন, সেই দানের সত্য ও পুণ্যশক্তির প্রভাবে যেন তাঁর চক্ষু পুনরায় উৎপন্ন হয়।রাজার সত্যবাণী উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অলৌকিকভাবে তাঁর দুটি চোখ পুনরায় উৎপন্ন হলো। এই চোখ সাধারণ চোখ ছিল না; দান ও সত্যের শক্তিতে উৎপন্ন হওয়ায় তাকে সত্যপারমিতার চক্ষু বলা হয়। এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রভাবে অসংখ্য মানুষ সেখানে সমবেত হলো। দেবরাজ আকাশে উপবেশন করে রাজা শিবি ও সমবেত জনগণের উদ্দেশে ধর্মদেশনা করলেন। এরপর তিনি দেবলোকে প্রত্যাবর্তন করলেন।
দানের মহিমা প্রচার
পরবর্তীকালে শিবি রাজা তাঁর দানের মহিমা মানুষের মধ্যে প্রচার করার জন্য রাজপ্রাসাদের দ্বারে একটি বিশাল মণ্ডপ নির্মাণ করলেন। সমগ্র নগরের মানুষকে সেখানে আহ্বান করে তিনি নিজের চোখ দানের ঘটনা এবং তার অলৌকিক ফলাফল তাদের সামনে তুলে ধরলেন। তিনি নগরবাসীকে উদ্দেশ করে বললেন—জীবনে ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে দান, পরোপকার ও কল্যাণের পথে অগ্রসর হতে হবে। মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদের পরিমাণে নয়, বরং সে কতটা ত্যাগ করতে পারে এবং অন্যের কল্যাণে কতটা নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।
শিবি জাতকের মূল শিক্ষা
শিবি জাতকের মূল বিষয় হলো দানপরমিতা ও আত্মত্যাগ। বোধিসত্ত্ব শিবি রাজা নিজের সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান অঙ্গ—চোখ পর্যন্ত দান করে দেখিয়েছেন যে সত্যিকারের দান হলো এমন দান, যেখানে দাতার মনে কোনো স্বার্থ, ভয় বা অনুশোচনা থাকে না। এই জাতক আমাদের আরও শিক্ষা দেয় যে, সত্য, করুণা, ত্যাগ ও পরোপকার মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ অলংকার। সম্পদ মানুষকে বড় করে না; বরং সম্পদের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে অন্যের কল্যাণে তা ব্যবহার করাই মানুষকে মহৎ করে তোলে। শিবি রাজার চোখদান কেবল একটি শারীরিক অঙ্গ দানের ঘটনা নয়—এটি বোধিসত্ত্বের সর্বোচ্চ ত্যাগ, দৃঢ় সংকল্প এবং সর্বজ্ঞতার পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শিবি জাতক বৌদ্ধ নৈতিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাজা শিবি নিজের দেহের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ চোখ পর্যন্ত দান করে প্রমাণ করেছেন যে মহৎ আদর্শের কাছে ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, ভয় ও যন্ত্রণা তুচ্ছ। তাঁর দান ছিল নিঃস্বার্থ, তাঁর সংকল্প ছিল অটল এবং তাঁর হৃদয় ছিল অসীম করুণায় পূর্ণ। শিবি জাতকের কাহিনি তাই শুধু অতীতের একটি বিস্ময়কর গল্প নয়; এটি মানবতার চিরন্তন আহ্বান। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের দুঃখ মোচন করা, বিপন্নের পাশে দাঁড়ানো, সম্পদের প্রতি আসক্তি কমানো এবং সত্য ও কল্যাণের পথে জীবন পরিচালনা করাই এই জাতকের প্রধান শিক্ষা। বোধিসত্ত্ব শিবির আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নিজের জন্য বাঁচা সাধারণ জীবন, কিন্তু অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাই মহৎ জীবনের প্রকৃত পরিচয়।
No comments